Sunday, 28 October 2018

সমাজ -- প্রলয় নাগ

সমাজ
প্রলয় নাগ

গ্রাম-সমাজের সঙ্গে লড়াইটা আমার বেশ পুরনো। যদি সে সমাজ লোপ পাচ্ছে, রূপ বদলাচ্ছে তবু আমি সে লড়াইটা জিইয়ে রাখবো।
আমাকে বার বার সমাজের দোহাই দেওয়া হয়। সমাজ এই মানবে না, সমাজ ওটা মানবে না! আমার ইচ্ছে করে সমাজের বুকের ওপর করালবদনীর মতো এক পা উঠিয়ে দেই।
আমার বাবাও তখন সাবালক হয়ে ওঠে নি। দেশ ভিটে মাটি ছেড়ে এদেশে আসার এক দশকও পূর্ণ হয়নি। আর্থিক সঙ্কটে পরিবারটি জর্জরিত। কোনওরকমে দিন চলছে, একবেলা দু'বেলা খেয়ে পরে দিন পাড়ি দেওয়া কথা, বিলাসিতা তো দূরের কথা!  আর সে সময় আমার ঠাকুরদা হঠাৎ  এক কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। কয়েকদিন পরে তিনি প্রাণ ত্যাগ করেন। আর সে সময় ঠাকুমার পক্ষে মৃতদেহ বাড়িতে এনে সৎকার করার মতো টাকা পয়সা কিছুই ছিল না। বাধ্য হয়ে তিনি শহরের সৎকার সমিতির হাতে দায়িত্ব তুলে দেন। সৎকার সমিতি মৃতদেহ দাহ করে। এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। সমস্যা শুরু হল এরপরে। গ্রাম-সমাজের রক্ষক-রা আপত্তি তুললেন। তারা শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে অংশ নেবেন না।  যেহেতু তারা মৃত দেহ দাহ করেন নি বা দাহ করতে স্বচক্ষে দেখেন নি, তাই।  আমার ঠাম্মা সম্পূর্ণ নিরুপায়।  সমাজপতিরা বিধান দিলেন, আবার মৃতদেহ দাহ করতে হবে। আর এটা না করলে সামাজিক ভাবে বয়কট করা হবে পরিবারটিকে। শেষপর্যন্ত তাই হল। খড়ের পুতুল গড়ে আবার গ্রামের নদীর ঘাটে দাহ করা হল ঠাকুরদা -কে।

Monday, 22 October 2018

আহ্লাদে আটখানা - প্রলয় নাগ


আহ্লাদে আটখানা
 সাতে পাঁচে নেই
মাঝখানে যেইজন
পথ পাবে সেই...
কেন জানি না বহুদিন আগে  'পাতাল ঘর' ছবিতে শোনা লাইনগুলো মনে পড়ছে। তারওপর সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠেই দেখি এক বান্দা খবর পড়ে যাচ্ছে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। আমিও পুরো আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেছি! পুরো ঝিঙ্কু কেস। আমার চিরকালের শ্রেষ্ঠ বীর তাও বাঙালি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী!  অনেকে ফেসবুকে হোয়াটস অ্যাপে খুশির বার্তা পাঠাচ্ছেন, ছড়াচ্ছেন।  বাহ্ মোদি জী বাহ্! আমার গলা দিয়েও বেরিয়ে এলো -- মিঁত্রো! তারপর নিজের গলা নিজেই টিপে ধরে বললাম চুপ শালা! ভালো কাজেও সমালোচনা!  আবার আগ বাড়িয়ে এসে দু'একজন জিগ্যেস করছে: বল সমর্থন  করিস না?  সত্যি তো সমর্থন না করে উপায় আছে!
-- হে ভারত শ্রেষ্ঠ বীর আপনাকে আমার কিছু কথা বলার আছে। আপনি বেঁচে আছেন নাকি মরে গেছেন আমি জানি না। কিন্তু আপনার মৃত্যু হয়েছে আমি তা বিশ্বাস করি না। আপনি আমাদের ভারতবাসীর হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন, থাকবেন। কে আপনাকে প্রধানমন্ত্রী করল না-কি রাষ্ট্রপতি বানিয়ে দিল তাতে কিছু যায় আসে না। আপনার স্থান সবার ওপরে। আপনাকে নিয়েও নোংরা সেন্টিমেন্টের রাজনীতি খেলা শুরু হয়েছে। ক্ষমতা-প্রতাপের রাজনীতি আপানার মতো ব্যক্তিত্বকেও হাতিয়ার করে চলেছে। ইতিহাস বাদলাতে চাইছে তাদের উত্তরসূরীরা। হাজার হাজার বাঙালি নিধন যজ্ঞে মেতেছে যারা, তারা আবার আপনার মতো শ্রেষ্ঠ বাঙালি বীরকে এই শিরোপা দেয়। এ আরও এক নতুন খেলা। বাঙালি সেন্টিমেন্টের খেলা। ভোট ব্যাঙ্কের খেলা!

Tuesday, 21 August 2018

ফণিদার চায়ের দোকানের আড্ডা ২ --- প্রলয় নাগ

ফণিদার চায়ের দোকানের আড্ডায়...
দু'তিন হল বিছানায় শুয়ে আছি।  কলের পাড়ে পড়ে গিয়ে ডান পায়ের বারোটা বাজিয়ে ফেলেছি, কোনও রকমে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটি। দু'দিন বিছানায় পড়ে থেকে আজ আর ভালো লাগছিল না। কোনও রকমে গিয়ে ফণিদার দোকানে গেলাম। ফণিদা আমায় দেখেই বলে উঠলেন-
--- কি রে তুই বাইচ্যা আছিস! আমি তো ভাবসি মরসস!
--- আর কইও না ফণি দা! আর পারতাসি না। খুব ব্যথা! কিছুতে কমসে না।
ফণিদার দোকানে দেখি আজ একটা নতুন আইটেম করেছে। গরম গরম পেঁয়াজি ভেজে থালায় রাখা।  আমি গিয়ে সোজা থালায় হাত দিতেই ফণিদা তেড়ে এল।
--- এই,  র- -- র - র- র। সাবধান থালায় হাত দিবি না! বয়সটা দেখছস তর। এই বয়সে কোন হাত দিয়া কি করস  তার ঠিক আছে! সাবধান।  কি লাগে আমার কাছে চাবি, আমি দিমু।
--- তুমিও পারো ফণিদা!
বলে আমি পেছনে নড়বড়ে বেঞ্চটাতে বসে পড়লাম। ফণিদা সদানন্দবাজারের  রবিবাসরীয়র একটি ছেঁড়া কাগজে কয়েকটা পেঁয়াজি দিল। আমি খেতে খেতে বললাম,
--- ফণিদা দ্যাশের পরিস্থিতিটা ভালা না, বুজলা! কেরলে বন্যা!
--- নিজের পরিস্থিতির কথা আগে চিন্তা করে পরে দ্যাশের-টা ভাবিস। বুজলি! ফণিদার উল্টা সাজেশন।
--- হুম। তবু তো।..... শুনলাম কেন্দ্র ৫০০ কোটি দিল। দেশ বিদেশ থেকে টাকা আসতেসে।
-- জনগনের টাকা জনগনরে দিসে।  ওগুলা ছাড়! তুই কত দিসস আগে শুনি?
--- আমি কত দিমু।  বেকার! তবু একশ' দিলাম।
--- বেকার বেকার কইরা আর কতদিন।  এখন একটু জোয়াল কাঁধে নেও। বাপের ঘাড়ে আর কতদিন বন্দুক রাখবা।  টাকার কথা ছাড়ো। এই বন্যায় কে কত দিতাসে ধুলায় বৃষ্টিতে অন্ধকার। শেয়ার বাজারের মতো তাগর দেখি টাকার অঙ্ক বাড়ে আর কমে। কেউ বিশ লক্ষ দিলে শুনি বিশ কোটি  হইয়া যায় আর কেউ বিশ কোটি দিলে শুনি বিশ লক্ষ। এগুলার খেলা তর আমার কচি মাথায় ঢুকব না। একশ' দিসস এটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাক যে আমি দিসি। তর এই একশ মনে রাখবি একশ কোটির সমান।
--- তুমি কত দিলা?
--- আমি আর কত দিমু! কৌটা কালেশনে আইছিল, বিশ টাকা দিসি।
--- মাত্র বিশ টাকা?
--- তাইলে কত দিমু বিশ কোটি? আমি টাটা, বিড়লা না আম্বানি? শোন যাদের দেওয়ার সামর্থ আছে, একশ' কোটির মানুষের ওপর দিয়া  যাদের বাজার ওঠা নামা করে, সারা জীবন ধরে কামইতাসে তারা চুপ করে বসে আছে। এই সময় তাগরে খুঁইজ্যা পাইতি না। তাদের গায়ে এহন বাতাস লাগবো না।  বুজলি, আর আমি তো সামন্য চা-ওয়ালা।
--- চা-ওয়ালা সামান্য কে বলল? চা-ওয়ালাই তো দ্যাশের ভবিষ্যৎ!
--- শোন রাজনীতির কথা ছাড়! সেনা বাহিনীদের দেখ? কি ভাবে কাজ করতাসে। এই সময় টাকা দিয়া কি হবো। জীবন মরণ এক কইরা মানুষ বাচাইতাসে। এরাই দ্যাশের ভবিষ্যৎ। এক সেনা দুই শ্রমিক আর কৃষক। বাকিরা সব শোষক।
--- আর শিক্ষক?
--- শিক্ষকরা তো জাতীর মেরুদণ্ড!
............................................
বিপর্যয় তো বলে কয়ে আসে না। সেখানে রঙিন  রাজনীতির খেলা না খেলাই বরং ভালো।  মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও,
মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও,
মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।
তোমাকে সেই সকাল থেকে তোমার মতো মনে পড়ছে,
সন্ধে হলে মনে পড়ছে, রাতের বেলা মনে পড়ছে।
মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও,
এসে দাঁড়াও, ভেসে দাঁড়াও এবং ভালোবেসে দাঁড়াও,
মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও। (শক্তি চট্টোপাধ্যায়)



ফণিদার চায়ের দোকানের আড্ডায়. ১-- প্রলয় নাগ

#ফণি-দার চায়ের দোকানের আড্ডায়...

সন্ধ্যায় প্রতিদিন ফণি-দার চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেই। যোগেন, হরি, নকুল এরা সকলেই আসে।  আমি যেতেই ফণি-দা এক কাপ চা দিলেন। চায়ে চুমুক দিয়েই দেখি মিষ্টি খুব বেশি।
--- এত মিষ্টি কেন?
--- আরে একটু  খা। কিসু হবে না।  কত দিন আর বাঁচবি। খায়া মর।--- ফণিদা বললেন।
--- তা ঠিক খাইয়াই মরি!
--- দেখছস চার পাশে কত লোক মরছে। আজ অমুক লেখক কাল তমুক মন্ত্রী। একদিন দেখবি এই ফণিদাও নেই! জীবনে কিছুই করতে পারলাম না!
--- মোড়ের মাথা এত জমজমাট চায়ের দোকান--- এটা কম কী?  সবাই কত ভালোবাসে তোমায়! --- হরি বলল।
--- হুম। ভালোবাসে কিন্তু বাকি পইসাগুলো তো দেয় না।
-- দেবে দেবে!
--- মরলে পরে দেবে!
--- তুমি এতো সহজে মরবা না। তোমাকে আমরা মরতে দেব না।---  যোগেন কথা শেষ করেই ফণি- দাকে দু'হাতে কোলেই তুলে নিল।
--- নামা! নামা!  নামা কইতাসি। এত পীড়িত দেখাইতে লাগবো না। বাকি পইসাগুলা দিস! তাইলেই হবে।
আমরা সবাই এটা দেখে  হাসতে লাগলাম। আমি বললাম:
--- ফণিদা তুমি মরলে আমরা দৈনিক কাগজের প্রথম পাতায় খবর ছাপাবো। হেড লাইন হবে 'আমাদের ফণিদার মহাপ্রয়াণ'। তারপর শোক বাক্যে পাতা ভরিয়ে তুলব।
---  ক্যান? আমি বাইচ্যা থাকতে কী আঁটি বানলাম যে মইরা গেলে মহাপুরুষ হমু? ওই সব দালালিগিরি প্রয়োজন নাই। তরা কী ভারতীয় মিডিয়া?
--- আমরা তোমায় ভালোবাসি!  এইটুক তো করতেই পারি!
ফণি-দা আবার শুরু করলেন:
--- শোন বইচ্যা থাকইক্যা যদি ভালো কাজ করতে না পারিস তবে মইরা স্বর্গ যাবি আশা করিস না। এই যে লুইচ্যা সুনীল কয়েকদিন আগে মরল। সবার কি দুঃখ! ও কেউ রে শান্তি দিসে বাইচ্যা থাকতে? মরার পরে এত আবেগ দেখায়া লাভ নাই। এই যে  ভারতের দক্ষিণে পশ্চিমে এতো বড়ো বড়ো সাগর মহাসাগর--- কারণ কী জানস? ভারতবাসীর আবেগ। আর এই আবেগের  জল গঙ্গা- ব্রহ্মপুত্র-গোদাবরী দিয়া  নামে ওই সাগরে জমা হয়। আর বাঙালির কথাতো কইস না! বাঙালির এতো আবেগ সামাল দেওয়ার জন্যেই বাংলায় এতো নদ- নদী। সব জল জমা হয় বঙ্গোপসাগরে। বুঝলি!
--- তাহলে  তুমি কও মানুষ মরলে কাঁদমু না?-- যোগেনের জিজ্ঞাসা।
--- একশ' বার কাদঁবি, কিন্তু ভালা মানুষের জন্য।
--- তুমি মরলে?--- আমি প্রশ্ন করলাম।
--- আমি তো মরা-ই।  আর মরমু কেমনে?

Thursday, 26 July 2018

মুর্শিদাবাদ ডায়েরি --প্রলয় নাগ

মুর্শিদাবাদ ডায়েরি
প্রলয় নাগ

 জানালা দিয়ে সুড় সুড় করে পদ্মার শীতল হাওয়া ঢুকছে। এ সময় পাখা বন্ধ করে দিলেও কিছু যায় আসে না।  ঢাকনা ছাড়া পুরনো নোংরা বালিশটা টেনে তার ওপর আমার সখের অসমিয়া গামোছাটা বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম। ক্লান্ত শরীর, জিরিয়ে নিচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখে তন্দ্রা এল। কে যেন নরম হাতের আঙুলের স্পর্শে চোখের পাতা দুটি বুজিয়ে দিল। অনেকটা পুরনো পরিচিত সেই হাতের স্পর্শের মতোই। বলল,
--- এখন একটু ঘুমোও! পরে আমি ডেকে দেব!
পুরনো প্রাসাদের অংশ বিশেষ, মতি ঝিলের পাশেই। ওপর তলাটা গেস্ট হাউস। নিচ তলাটা প্রায় পরিত্যক্ত। কেবল একজন বৃদ্ধের ঘর। উনিই এসবের কেয়ারটেকার। বৃদ্ধের হাঁপানি রোগ। কাশতে কাশতে নুয়ে পড়েন। প্রথম সাক্ষাতেই বিনে পয়সায় উপদেশ দিয়ে দিলাম।
---আপনি বাদুরের মাংস খান হাঁপানি ছেড়ে যাবে!
অনেক কষ্টে ওপরে এসে একখানি ঘর খুলে দিলেন। আর তার উল্টোদিকে টয়লেট বাথরুম। বললেন,
---রাতে পশ্চিমের জানালাটা খুলেবেন না বাবু!
 কথাটার মানে ঠিক বুঝতে পারলাম না। আবার ভাবলাম মশা-টশা আসবে তাই হয়তো বলছেন। ঘরে প্রবেশ করেই চোখে পড়ল হরেক রকমের দেয়াল লিখন। কোথায়ও নগ্ন নারী দেহের চিত্র কোথাও বা উন্মুক্ত বুক। কোথায় আবার শ্যামলী প্লাস সুশান্ত। হাত-মুখে জল দিতে গিয়েও দেখি সে জায়গাটা অবস্থা আরও শোচনীয়। দেওয়াগুলির অবস্থা 'ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি।' বৃদ্ধের কাছে শুনলাম এখান থেকে পদ্মা খুব বেশি দূরে নয়। পায়ে হেঁটে মিনিট কুড়ি হবে। বিকেলে বেশ মনোরম ঠাণ্ডা বাতাসও আসে। বৃদ্ধ আমায় জিজ্ঞেস করলেন,
---রাতে কি খাবেন আপনি?
গতকাল দিন-রাত  ভালো করে কিছুই খাওয়া হয়নি। ট্রেন যাত্রার ধকল গেছে, রাতে খেতে হবে। তাঁকে বললাম,
--- আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমি এক ফাঁকে গিয়ে খেয়ে আসব। আর একটা রাতেরই তো ব্যাপার!
বৃদ্ধ চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পড়ে একটা মোমবাতি আর দেশলাই দিয়ে গেলেন। বললেন,
--- রাতে কেউ এসে দরজা ধাক্কালেও খুলবেন না। এমনকি আমি এলেও না।
--- বেশ!
আবার মনের মধ্যে একটা খটকা লাগল। ভাবলাম বর্ডার এলাকা-- তাই হয়তো। অনেক সময় অপরাধীরা রাতে আশ্রয়ের খোঁজে ভালো মানুষ সেজে আসে। আবার ভাবলাম তাহলে বৃদ্ধ নিজের কথা বলল কেন?
   স্নান সেরে বিছানা মশারি ঠিক করতে করতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এল। পেটে খিদেও দাউ দাউ করছিলও, খেয়ে এলাম। এবার সোজা মশারির ভেতর। আগামীকাল কী কী করতে হবে তাই নিয়ে ভাবছি। মাধব বলেছিল,
---দাদা হাজার দুয়ারিটা দেখে এসো। আর ঘসেটি বেগমের ছুরিটাও..!
তা-ও ভাবছি,একটু সময় পেলে যাব। তারপর মোবাইলে ডাটাটা অন করে কিছুক্ষণ সোসাল নেটওয়ার্ক আর হট্ আন্টি এসব করতে করতে সাড়ে দশটা বেজে গেল। না আর পারছি! এবার  মোবাইলটা চার্জে দিয়ে অপরটি  বালিশের কাছে রেখে শুয়ে পড়লাম। শুনতে পাচ্ছি দূরে সার্কাস ভেঙেছে। লোক ফিরছে দলে দলে। বৃদ্ধের কাশিও শুনতে পাচ্ছি না। এই বিশাল প্রাসাদ কক্ষে আমি একা, কাটাতে হবে একটি রাত, সম্পূর্ণ একা। কেউ নেই আশে পাশে। নিজেকে মনে হচ্ছে সিরাজ। আমার চারপাশে কারা যেন তরবারি হাতে আমাকে পাহারা দিচ্ছে। সবার চোখেই চক্রান্তের চিহ্ন। আমার ঘোড়া ছুটে চলেছে দূরে । সমুদ্র পাহাড় নদী মাঠ পেরিয়ে। আমি নিহত হয়ে পড়ে। কান্না! কে কাঁদছে? বড় চেনা সে স্বর। জোরে আরও জোরে,  শুনতে পাচ্ছি পাচ্ছি সে স্বর। সে কান্নার শব্দ যে এ ঘরের চার দেওয়াল ভেদ করে আমার কাছেই আসছে।  হঠাৎ ভয়ঙ্কর বিভৎস এক চিৎকার। নারীর কণ্ঠ, অস্পষ্ট।
---দরজা খোল! আমি এসেছি।
---দরজা খোল!
এবার যেন আরও জোরে। পশ্চিমের জানালায় খটখট্।
 ---দরজা খোল! আমি এসেছি!
দক্ষিণের জানালায় খটখট। পুরোনো কাঁচের ওপাশে অস্পষ্ট মুখ। আর চকচকে ছুরি!
---দরজা খোল! আমি এসেছি।
আমি ভয়ে জড়সড়। মশারির ভেতর থেকে এপাশ-ওপাশ করছি! ক্রমশ চিৎকার আর জোরে, আরও খটখট। দরজা খোল! আমি এসেছি। আমি চুপ! যেন কেউ নেই ঘরে! কেউ নেই!  ঘামে শরীর ভিজে বিছানা ভিজে যাচ্ছে। এবার বৃদ্ধের কাশির শব্দ, দরজায় খটখট-
---দরজা খুলুন। দরজা খুলুন।
বৃদ্ধ যেন দরজা ভেঙে ফেলবে। এত জোর কোত্থেকে পেল সে। সে তো কাশতে কাশতে নুয়ে পড়ছিল।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। ঘরটায় শীতল হাওয়ার প্রেমিকা সুলভ আদরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই। ঘুম ভাঙল হস্টেলের মেয়েদের ডাকেই।
--- দাদা...ও দাদা!  দাদা...ও দাদা!
  অলস শরীরটাকে টেনে নিয়ে জানালা কাছে গিয়ে নিচের দিকে তাকালাম। দেখি হস্টেলের মেয়েরা ডেকে যাচ্ছে।
--- তুমি আজ একা থাকবে। আজ রাতে তোমাকে ভূতে ধরবে।
--- হুম..! কোথায় যাচ্ছো সব দল বেঁধে ?
---জল আনতে!
--- যাও!
হস্টেলের জল ভালো নয়। মেয়েরা রোজ বাইরে থেকে জল এনে রাখে। আবার বিছানায় ফিরে এলাম। দিনের বেলা এই স্বপ্ন!  মুডটা বিগরে গেল। ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয় কিন্তু দিবা-স্বপ্ন কী হয় জানি না। স্বপ্ন স্বপ্নেই থাক। সন্ধ্যাও হয়ে আসছে, আমি বিছানা ছেড়ে উঠলাম।
সন্ধ্যার একটু পরে খেয়ে দেয়ে বিছানায় এলাম। হাতের কাছে রেখেছি এক মাত্র সম্বল ফল কাটার একটা ছুরি। পশ্চিমের জানলাটা বন্ধ আছে কিনা আবার দেখে নিলাম।  ভিন্টিলেশনের ফাঁকে পাখিগুলি বাসা বেঁধেছে, খুব বেশি কিচিরমিচির করছে। হস্টেলের মেয়েরা  গানের লড়াই শুরু করেছ, একটু আধটু শোনা যায়। জানালা বন্ধ করে টিভি চালিয়ে বসেছি। তখনই ঘর অন্ধকার, লাইট চলে গেল। জলের ট্যাবটা ঠিকঠাক বন্ধ হয় না। টিপ টিপ করে জল পড়ছে। মনে হচ্ছে কেউ যে নিরাপদে পা ফেলছে। ঘরে মোমবাতি জ্বেলে বসেছি। আমি আর মোমবাতি এক সাথে পুড়ছি। জানি না কে আগে শেষ হবে! একবার ভাবলাম গার্ডকে ডেকে নিয়ে আসি আবার মনে হল, না থাক! একটা রাতই তো!
পরদিন সকালবেলা নিজেকে আবার বিছানার খুঁজে পেয়ে একটু মনটা ভালো লেগেছিল। না আমি পেরেছি শেষপর্যন্ত!
রুম ছেড়ে বেরিয়ে আসতে গিয়ে বৃদ্ধের হাতে ঘরের চাবিখানি বুঝিয়ে দিতে গেছি। বৃদ্ধ তাঁর খাটের ওপর বসে তামাক খাচ্ছেন। চাবিটা বুঝিয়ে দিয়ে ভাবলাম একবার নামটা জেনে নেই!
--- আপনার নামটা তো জানা হলো না।
বৃদ্ধ কাশতে কাশতেই জবাব দিলেন,
--- নাম! নাম দিয়ে আর কি হবে বাবু?
--- তবু তো! আমাদের সকলেরই একটা নাম, পরিচয়....!
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই বৃদ্ধ বললেন,
---সিরাজ!

Tuesday, 24 July 2018

নাবিকের ডায়েরি - প্রলয় নাগ পর্ব -৪ I think therefore, I am..

নাবিকের ডায়েরি
পর্ব -৪
I think therefore, I am..

তো ইন্ট্রোর ঝক্কি পার করে একদিন নাবিক ক্লাসে এসে উপস্থিত হল। পিজির লেবেলের প্রথম ক্লাস। আর প্রথম ক্লাসেই লেট। ক্লাসে এক ঝাঁক মাছের মতো এক ঝাঁক তরুণী। কী জানি কোন কারণে  একজন ছেলেও সেদিন ক্লাসে ছিল না।  ক্লাসে ছেলেদের মধ্যে একমাত্র নাবিক, তাও কিনা ক্লাস শেষ হবে হবে করছে তখন এসেছে।
পুরনো টেরাকোটা কালারের দেওয়াল ও টিনের ছাউনি দেওয়া দুটো ঘরে ক্লাস হতো তখন। পাশে দুটো ঘরে সমস্ত স্যার ম্যাডারা একসাথে বসতেন। তারপাশেই অফিস ও অফিসের পেছনে বিভাগীয় প্রধানের ঘর।
বিভাগের সামনে বেশ কিছুটা খালি জায়গা, বাগান গোছের কিছু একটা। আর কয়েকটি গাছের গোড়ায় বসার জন্য বেদি করে দেওয়া হয়েছে। ক্লাস শেষ হলেই সবাই গিয়ে ওই বেদিগুলোতে বসতো। সবগুলো গাছ বড়ো না হলেও বেশ কিছু গাছ একটু মোটাও ছিল। আর তাতে খোদাই করা ক'জনের কত স্মৃতি! কেউ আবার গাছের আড়ালে চক দিয়ে 'বাল' কথাটাও লিখে রেখেছে।  বাংলা বিভাগের পেছনে ছিল ইতিহাস বিভাগ। নাবিকের বরাবর মনে হয়েছে ইতিহাসের মেয়েগুলো যেন বেশি সুন্দরী।
 প্রথম দিনের ক্লাস প্রায় শেষের পথে।  নাবিক পেছনের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল:
--- স্যার! আসবো?
--- এসো! এসো!
 শিক্ষকের সম্মতি পেয়ে নাবিক ক্লাস রুমে প্রবেশ করে পেছনের দিকে একটি কাঠের চেয়ারে বসল। ক্লাস যথারীতি চলতে লাগল। আসলে সেদিন ওটা ক্লাস ছিল না সেটা ছিল পরিচয়-পর্ব। গাল ভর্তি চাপ দাঁড়ি, কালো টি-শার্টে কিছু লেখা রয়েছে, খাকি জিনস আর আর উডল্যান্ডে লেগে থাকা লাল হলদে পাহাড়ী মাটি। হেসে হেসেই কথা বলছেন সবার সঙ্গে। নাম জিগেস করছেন, কোথায় থেকে এসেছি, কোন কলেজে পড়েছি ইত্যাদি,ইত্যাদি। মনে হচ্ছে এই উপত্যকার সমস্তটাই চষে বেরিয়েছেন উনি, সব জায়গাই যেন তার চেনা।  সবশেষে এলো নাবিকে পালা।
--- তুমি...?
--- নাবিক সরকার। মাথাভাঙ্গা কলেজ, কোচবিহার।
--- বেশ! তা এখানে কোথায় আছো? কোন মেসে?
--- হোয়াইট হাউসে।
--- আচ্ছা!
নাবিক বুঝেগেছে আইরংমারা সব মেসগুলোর খবরও উনি রাখেন। এরপর উনার পড়ানোর নিজস্ব শৈলী নাবিকের মতো সবাইকেই মোহিত করেছে। কথা বলার মাঝে হাত দুটো ওপরে তুলে 'কোট আনকোট', কিংবা ক্লাসে ছেলে মেয়ের ডিভাইডেশনকে ভেঙে দেওয়া  আবার পড়ানো ফাঁকে গেয়ে ওঠা ' If you miss the train i'am on" ইত্যাদি বিষয়গুলো সবাইকে আকৃষ্ট করত। নাবিকের মতো অনেকের কাছেই তা ছিল অভিনব।
নাবিকের মতো অনেকই উত্তরবঙ্গের জেলাগুলি থেকে পড়তে গিয়েছে। তখন উত্তরবঙ্গে একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়াটাই অনেক বড়ো কিছু। বি.এ ক্লাসে টিউশন পড়া আর নোট মুখস্ত করা জ্ঞানের বহর আর কতটুকু?  তারা কী করে বুঝবে উপনিবেশবাদ কী? অথচ তারা উপনিবেশের জোয়াল কাধে বহন করে চলেছে এখনও। নাবিক জন্মের পর থেকে দেখে এসেছে উত্তরের  যেন কোনও স্বতন্ত্র আইডেনটিটি নেই। সবটাই চলে দক্ষিণের অঙ্গুলি হেলনে।
ক্লাস জমতে শুরু করে। অনেক বন্ধু, তর্ক-বিতর্ক, মেইন গেটে দোকানের পেছনে সিগারেটে টান পাশাপাশি ''আমার না ওকে খুব ভালো লাগে!' এসব কিছুই চলতে থাকে। একদিকে আধুনিকতা, আধুনিকোত্তরবাদ আর অন্যদিকে স্বদেশীয় উত্তর-আধুনিকতা উঁকি মারতে থাকে।  মার্ক্স, ফ্রয়েড, ফুঁকো, লাকা দেরিদা, ফ্রেডরিক জেমসন, সার্ত্র,  গায়ত্রী স্পিভাক, প্রতীচ্য সাহিত্য তত্ত্ব পাশাপাশি বৈষ্ণব পদাবলীর সুর ঝংকার সব মিলে মেশে একাকার।   ক্লাসে স্যার বলতেন -- 'তোমরা প্রশ্ন করো? তোমাদের ভেতর যদি প্রশ্ন জাগাতে না পারি তবে সে আমারও ব্যর্থতা।"
 চিহ্ন-চিহ্নায়ক-চিহ্নায়িত, তাঁকানো থেকে দেখার চোখ সবে তৈরি হচ্ছে । নাবিক ভাবে-- I think therefore I exist. নাকি I exist therefore I think.!  সময় ও পরিসর নাবিকদেরও পাল্টে দিয়েছে। তৈরি হয় দেখার চোখ, উপনিবেশোত্তর চেতনাবাদী পাঠ কিংবা  ''আসলে আমরা কেউ পুতুল নই" বা "আসলে আমরা সবাই পুতুল" ইত্যাদি। মজিদের মাজারে জমিলার পা তুলে দেওয়া তো আসলে ক্ষমতা বা প্রতাপের বিরুদ্ধাচরণ করা। এমনি এক জমিলাও এসেছিল, চলেও গেছে, চিরতরে!  নাবিক বুঝেছে আসলে সব তত্ত্ব জীবনেই মিশে আছে, কেবল খুঁজে নিতে হয় মেলানোর জন্য।
নাবিকদের কাছে বড় পাওনা ছিল উপাচার্য মহাশয়ের ক্লাস। মেঘনাদবধ কাব্য, রক্তকরবী  পড়িয়েছেন। বুঝিয়েছেন সাহিত্যতত্ত্বের মূল নির্যাস। অমিত্রাক্ষরের ছন্দের মাঝে এসেছে গ্রীক ট্র্যাজেডির কথা,  রক্তকরবীর রাজা আর নন্দিনীর কথা কিংবা কর্ষণজীবী ও আকর্ষণজীবী মানুষের কথা। আর শেষপর্ষন্ত 'জয় নন্দিনীর জয়', প্রাণের জয়। সপ্তাহে দু' তিনটে ক্লাস নিতে ছুঁটে আসতেন। তার ক্লাস করার জন্য অনেক সিনিওর দাদারাও পেছনে বসে যেতেন। তার বই পড়েই নাবিক জেনেছে সাহিত্য সমালোচনা কেবল মাত্র প্রশস্তি নয়, ভিন্ন একটা দিকও রয়েছে। যখন তিনি সত্তরের দশকের গল্প বলতেন, গা শিউরে উঠেছে নাবিকের মতো অনেকর-ই।... ( চলবে)

Monday, 3 July 2017

কাকতাড়ুয়ার গল্প -২ প্রেম পর্ব


।। প্রলয় নাগ।।

লোকে বলে কাকতাড়ুয়াকে তার বাপে কুড়িয়ে পেয়েছে । বাপ মুড়ি বিক্রি করত ট্রেনে ট্রেনে। এক ঝড় বাদলে রাতে কাকতাড়ুয়াকে বাড়িতে নিয়ে আসে।সৎমা কাকতাড়ুয়াকে মেনে নিতে পারেনি তুমুল ঝগড়া হয় বাপ মায়ে। কাকতাড়ুয়ার ভাগ্যে  যশোদার মতো মা জুটল না আর কি! কাকতাড়ুয়ার কোন আক্ষেপ নেই। থাকবে কোত্থেকে, তখনও তার বোঝার বয়সটি হয়নি।
কিছুদিন পরে বাপ মরল সাপের কামড়ে বাপ মারা যেতেই সৎমা চার বছরের কাকতাড়ুয়া ফেলে এক পিয়াজের ব্যাপারীর সঙ্গে হাঙ্গা করে চলে আসে ধুবড়িতে সেইদিন ফেলে আসা শণের ঘরে কাকতাড়ুয়া বসে খুব কাঁদছিল, কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়ে তারপর কতজনের কতকি- মুড়ি, চালভাজা, ভাতের ফ্যান, বাসিপান্তা খেয়ে খেয়ে বড় হয়ে গেললোকের ধান গম বেগুন ক্ষেতে তেলের টিন বাজিয়ে বাজিয়ে কাকপক্ষী তাড়াতে তাড়াতে নাম হয়ে গেল কাকতাড়ুয়া এখন  নিউ জলপাইগুড়ি – নিউ বঙ্গাইগাও লোকালে মুড়ি চানা বিক্রি করে আরমাঝেমাঝে কুষানযাত্রার পালাতে বাঁশের বাঁশিবাজায় মাসে এক-আধ বার বাড়ি আসলে আসে, আর না হলে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের পাশে বস্তিতে এক বিধবার সাথে রাতে থেকে যায়
         কাকতাড়ুয়ার মনে আসে তার পুরনো দিন গুলির কথা হকার বন্ধুদের কাছে আক্ষেপ করে –‘ইস এখন যদি পাইতাম’ ট্রেনে চলতে অনেক মেয়েকেই সে দেখে  সব মেয়েকে তার  বোন-মা বলে মনে হয় না অনেককে দেখে চোখের সামনে তার অতীত জীবনটি ভেসে ওঠে তখন সে মুড়ির বাক্স নামিয়ে দরজা রেলিংয়ে ধরে   বুকের বোতাম খুলে দিয়ে বাতাস লাগিয়ে শরীর ঠাণ্ডা করে
 সব কথা তার মনেও নেই তার চেয়ে বয়সে বড় ধাড়ি ধাড়ি মেয়ে গুলো তাকে ডেকে নিয়ে যেত পাট ক্ষেতে বা নদীর চরে গরু চরাতে তারা নির্দ্বিধায় জামা খুলে ফেলত তার সমানে বলত- ‘সুড়সুড়ি দে’ ওসব  তখন সে কিছু বুজত না, ভাবতো এও বুঝি রান্নাবাটির মতো কোন খেলা 
একসময় ধীরে ধীরে কাকতাড়ুয়া সব বুঝতে শেখেএখন আর তাকে কেও ডেকে নিয়ে যায় না শীতের সকালে টিন বাজিয়ে কাক তাড়াতে ফ্রক পড়া মেয়েদের ডাকলেও আর তার কাছে আসে না
কাকতাড়ুয়া  জানে না প্রেম কী ? সে শুধু এই খেলাটাই জানত তার বিশ্বাস হয়ে গেছে প্রেম মানে ছোট বেলায় শেখা  এই খেলাটাই অনেক খেলেছে ও,   অনেককে দেখেছে এই খেলা খেলতে তার মাকেও দেখেছে বাবা বাড়িতে না থাকলে মদনের সাথে এই খেলা খেলছে হিরুয়াকে দেখেছে তার বৌ থাকা সত্ত্বেও ধান ক্ষেতে নিখিলার বৌয়ের সাথে ওই খেলা খেলছে
কাকতাড়ুয়ার মনে কি হয় না হয় সে বলতে পারে না গুছিয়ে একদিন এক বিকেলে পাশের বাড়ির লক্ষ্মীকে সে বলেছিল – ‘তুই আমার লগে পেম করবি?’ লক্ষী  চিৎকার করে তার মাকে বলে দেয়কাকতাড়ুয়ার কপালে জোটে ঝাঁটা জুতা তার পর থেকে সে ভয়ে কাওকে কিছু বলে না এর কিছুদিন পড়ে লক্ষ্মী ভরা পুকুরে পা পিছলে পরে গিয়ে ডুবে মরছিল কাকতাড়ুয়া জল খেতে খেতে বাঁচিয়েছেতারপর থেকে লক্ষ্মী-কাকতাড়ুয়ার একটা ভাব জমে উঠেছিল এসব দেখতে পেয়ে কম বয়সী মেয়েটাকে  জোড় করেই বিয়ে দিয়ে দেয় লক্ষ্মীর বাপ মাকাকতাড়ুয়ার মন খারাপ কিছুদিন কোথায় চলে গেছিল কেউ জানে না কিছু দিন পরে আবার ফিরে এলো গ্রামে 
  কাকতাড়ুয়াকে যারা প্রেম শিখিয়েছে তাদের সকলেরই  বিয়ে হয়ে গেছে কারো তো দু’তিনটে ছাওয়া পুয়াও হয়ে গেছে তাদের সাথে হঠাৎ দেখা হলে কাকতাড়ুয়া হাসি হাসি মুখ করলেও তারা যেন চেনেই না কাকতাড়ুয়াকে এমন ভান কাকতাড়ুয়ার মনে  প্রথম প্রথম একটু কষ্ট লাগলেও পরে সব সয়ে গেছে
কাকতাড়ুয়ার জীবনে একবার প্রেম এসেছিল তখন সে উনিশ কি কুড়ি  হবে চড়া রোদে ধান বাঁধতে বাঁধতে ক্লান্ত হয়ে ক্ষেতের পাশে বননাইল্যা গাছের নিচে বসে বিশ্রাম করছে পাশে  সুটকার জোয়ান বিধবা বৌ-টাও এসে বসল জল খাওয়াল কাকতাড়ুয়াকে তেষ্টায় কাতর কাকতাড়ুয়ার মনে হল এমন আদর করে কেউ কোন দিন তাকে জল খাওয়ায়নি
কাকতাড়ুয়ারও মনে হয় পছন্দ  হয়েছিল বৌ-টাকেতা না হলে সে দিন সন্ধ্যা বেলা গিয়ে হাজির হলই বা কেন তার বাড়িতে তারপর রোজ রোজ সন্ধ্যা  হলেই কাকতাড়ুয়ার আর দেখা পাওয়া না গল্পগুজব হাসিঠাট্টা রমরমা চলছে এরই মধ্যে দু’জনে একদিন নীলকুঠির মাঠে জ্যোতি বসুর জনসভাও করে এসেছে
 এর কিছুদিন পর কাকতাড়ুয়া ধরা পড়ল খড়ের গাদায় জোয়ান বৌটার সাথে পাড়াপড়শিরা মারধোর করে  কাকতাড়ুয়ার নাক মুখ ফাটিয়ে গ্রাম ছাড়া করল দু’দিন পরে বৌটিও বাড়ি ছেড়ে চলে গেল এ ঘটনার পর থেকে কাকতাড়ুয়ার গ্রামের প্রতি টান চলে গেছে আসলে আসে, না এলে বিধবা বৌটির সঙ্গে পড়ে থাকে স্টেশনের বস্তিতে আর জ্যোৎস্না রাতেবাঁশি বাজায়, গলা ছেড়ে গান ধরে –
‘সাধের জনম মাটি হইয়া গেল রে
প্রেম কইরাছি অবুজ বয়সে
প্রেম কারে কয় বুঝি নাই রে
সাধের জনম মাটি হইয়া গেল রে

~~~~~~~~~০০০~~~~~~~~~~~~~q

কাকতাড়ুয়ার গল্প -১


  ।। প্রলয় নাগ।।


 মাথাভাঙ্গা শহরে ঢুকতেই সুটুঙ্গা নদীর ওপর আব্বাসউদ্দিন আহমেদ সেতুসেতু পার করেই বা পাশে একটা পৌরসভার তৈরি করা পেচ্ছাবখানাতাড়াহুড়োর মাঝে সবাই এখানে চটজলদি কাজ সেরে নেয় আর সমস্ত পেচ্ছাবের ধারা গড়িয়ে কি সুটুঙ্গায় মেশে না-কি অন্য কোথাও যায় কেউ জানে না এই সেতু নিচে বছর ২১শের  ভেসে আসা এক যুবতী মেয়ের মড়াকে নিয়ে বেশ তোড়-জোড় শুরু হয়েছে  কবে ভেসে এসে এটা আটকে গেছে কেউ জানে নাআসলে কয়েক দিন পুজোর জন্য সবাই ব্যস্ত ছিল হয়তো   
সকাল সকাল কতগুলো জেলে ঠ্যালা জাল নিয়ে মাছ ধরতে এসে মড়াখানি আবিষ্কার করেছে তবে জেলেরা খুঁজে না পেলেও আজ সবাই টের পেয়ে যেত গন্ধ একটু আধটু বেড়তে শুরু করেছে কাকের উপদ্রবও বাড়তে শুরু করেছিল পেচ্ছাবখানার ওপরে বসে কাকগুলি কা-কা কা-কা করেছে মড়ার দিকে চেয়ে মনে হচ্ছেওদের ভাগের ধন অন্যকেউনিয়ে যাবে
আব্বাসউদ্দিন সেতুর ওপর মানুষের ভিড় জমে গেছে  বুড়া-ছুড়া সকলে মড়া দেখছে হা হুতোস করছে ভাগা পান  বিক্রি করা এক বুড়ি - ‘কত সুন্দর ফুলের মতো মাইয়াডা, এইডা কেমন কইরা  হইল?’ রিবন সানগ্লাস-পড়া ছোকরাদের মধ্যে কেউ বলছে- ‘মালটা খাসা ছিল রে উমমমু ছ্যাকাট্যাকা খাইছে হয়তো
পাশে নদীর ওপারে অভিজাত শ্মশান তার সাথে আর মা কালীর অধিষ্ঠান রোজ কেউ না কেউ পুড়ছে ওখানে
ঘণ্টা দু’য়ে-কের চেষ্টায় মড়াখানি নদী থেকে তুলে নিয়ে গেল পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য মৃতের চোখ দুটি হা-করে খুলেছিল আকাশের দিকে ঠ্যালা গাড়ি থেকে বাড় নেমে যাচ্ছিল  নীল বড়-পলিথিনে জড়িয়ে গুম ঘরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে শহরের মাঝখানে গুম ঘর পাশে বিশাল বড় কাঠালি-বট গাছ হাজার হাজার চাম বাদুর ঝুলে থাকে তার নিচে স্বাস্থ্য-দপ্তরের অফিস। দিনের বেলায় যেতে ভয় লাগে ওই পথ দিয়ে যে ঠ্যালায় করে মড়াখানি শহরের মধ্যে নিয়ে আসা হল সে ঠ্যালায় করে কিছুদিন আগের এক ছোকরাকে নিয়ে আসা হয়েছিল ছোকরার বিয়ে ঠিক হয়ে ছিল কিন্তু শরীরে ছিল সিফিলিস বা গনোরিয়া জাতীয় রোগ ছোকরাটিও ফাঁসি দিয়ে মরে, নিজের পরনের শার্ট দিয়ে
পরদিন খবরে কাগজে বড় বড় করে লেখা ‘যুবতী মেয়ের দেহ উদ্ধার ও গুম ঘর থেকে উধাও’ ছবিও ছেপে ছিল, সাথে দু’এক ছেলে ছোকরার ছবিখবরের কাগজে ছবি দেখে তাদের আনন্দে আর ধরে না
পুলিশ প্রশাসনের ঘাম ছুটে যাচ্ছে মড়া খুঁজতে খুঁজতে  এস.পি স্বয়ং খুঁজতে বেড়িয়েছে মড়া খানিঅতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী নিয়োগ হয়েছে যে করেই  হোক মড়া খুঁজে বেড় করতে হবে লাল-বাজার থেকে ঘন ঘন ফোন আসছে টিভি চ্যানেল গুলিতে ঘুরে ফিরে মড়ার খবর সন্ধ্যায় কি সব তর্কের আসরও বসেছে এই মড়াকে নিয়ে
শহর ভয়ে জর সড় কত আজগুবি গল্প কে নাকি দেখেছে মড়াটি শহরের বটগাছটিতে বসে বাদুরের সাথে গল্প করেছে আর স্বাস্থ্যদপ্তরে ঢিল ছুড়ছে কেউ মড়াটিকে সরকারি বাস-স্ট্যান্ডে ভেতরে শুয়ে থাকতে দেখছে কেউ মড়াটিকে নাকি এলআইসি অফিসে টাকার কিস্তি জমা করতে দেখছে এক বেকার ছেলে দেখেছে মড়াটি নাকি ভিড় ঠেসে এসএসসি-র ফর্ম তুলেছে পোস্ট থেকে কেউ বলছে মড়াটি নাকি সঙ্গীদের সাথে দল বেঁধে অপ্সরা হলে সিনেমা  দেখেছে কেউ  মড়াটিকে সন্ধ্যা বেলা পিট ব্যাগ নিয়ে টিউশন পড়ে বাড়ি ফিরতে দেখেছে কেউ মনীষী পঞ্চানন বর্মার মূর্তিটিতে ফুল দিতে দেখছে কেউ বলছে – ‘দুর্- এ হল ঢপের চপ গুম ঘর থেকে হয়ত শেয়ালে টেনে নিয়ে গেছে
 কিন্তু কোথায় মড়া ?
কেউ খুঁজে পাচ্ছ না গুম ঘরের লোকটিকে স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোকেরা দু’দিন থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চলেছে বেচারা কীভাবে জানবে? সে তো শুধু ঘরের তালাচাবি লাগায় আর খোলে
মড়া নিয়ে আন্দোলন হবে বিরোধীরা হুমকি দিয়েছেবিধান সভা ওয়াক আউট করেছেদক্ষিণী বুদ্ধিজীবীরা উত্তরে এসেছে মড়া খুঁজতে
মড়া পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও সরকার ঘোষণা করেছে মড়া খুঁজে দিলে দু’ লাখ
রাজা থেকে প্রজা সবাই মড়া খুঁজতে বেড়িয়েছে  ‘মড়া কোথাও নেই, তবে গেল কোথায়?’ – সকালে চায়ের দোকানের আসরে প্রশ্ন উঠছে

কিছুদিন মড়া পাওয়া গেল। হৈ হৈ রব উঠেছে চারদিকে। ধরলা নদীতে যুবতী মেয়ের মড়া। সবাই হন্যে হয়ে ছুটছে মড়া দেখতে । আকাশে বগি উড়তে উড়তে বগাকে বলে-‘এই বুঝি সেই মড়া।’ বগা বলে-‘না, এ মড়া সে মড়া নয়।’
এক বড় নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যদিয়ে গুমঘরে আনা হল এ মেয়েটির মড়াকেও। বড় বড় অফিসার পাহারায় নিযুক্ত। প্রশাসন বলছে –‘দেখি এবার মড়া কোথায় যায়?’
পর দিন খবরে কাগজে ‘আবার মড়া উধাও’  গুম ঘরের লোকটিকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ লাঠি ডাণ্ডা। লোকটির একি কথা-  ‘আমি কি জানি? আমি তো শুধু তালা লাগাই আর খুলি। মড়া কই কীভাবে কমু?’
                                 ……………………………………………………………….

অনুপ্রবেশ- প্রলয় নাগ

অনুপ্রবেশ
প্রলয় নাগ

পলক ১
-এক!
-ওই যে আরেকটা ছায়া!
-দুই!
-ওই দেখো পেছনে আরেকজন মাথায় বোচকা নিয়ে পাড় হচ্ছে !
- তার মানে তিন জন!
 - ওরাই হবে। চলো আমারাও এগোই।
তিন জন লোক গাছে থেকে নেমে ধীরে ধীরে কাঁটাতারের পাশে বড় শিমুল গাছটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। শিমুল গাছটা ঠিক কাঁটাতারের ঘেসে আকাশমুখী হয়ে উঠেছে। শিমুল গাছটা ওসব কাঁটাতার ফাটাতারের তোয়াক্কা করে না। দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। কে বা কারা যেন শিমুল গাছটা কেটে সিঁড়ি বানিয়েছে। রাত বি-রাতে যে লোক সীমান্ত পাড় হয় শিমুল গাছটাই তার সাক্ষী। প্রথমে একজন পাড় হয়ে এপারের  দলটার সাথে মিশে গেল।
হঠাৎ 'ফায়ার...!'

পলক ২
পরদিন খবরের কাগজে হেড লাইন- 'ভারত-পাক যুদ্ধের সূচনা।' পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে তিন জন ভারতীয় সেনা শহীদ হয়েছে। আর তার পাশে একোণে ছোট্ট করে ছাপা হয়েছে ' ঋণে জর্জরিত হয়ে কৃষকের আত্মহত্যার সংখ্যা দাঁড়াল ২৪'! কিন্তু সে খবরে কারও চোখ নেই। সবাই যুদ্ধ নিয়েই মেতে আছে। সকালে গরম চায়ের সঙ্গে বিস্কুট ভিজিয়ে খেতে খেতে যুদ্ধের খবর পড়ে সবাই। এক ফাকে বিস্কুট ভেঙেও চায়ের কাপে পরে যায়। আর হা-হুতাশ করে- 'দে পাকিস্থানরে গুড়ায়া! শালা তুরুখের দ্যাশ।
খবরের কাগজের তৃতীয় পাতায় ছাপা হয়েছে গত রাতের ঘটনাটি। সীমান্তে নিহত দুই অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি। যুদ্ধ পরিস্থিতি যে আসন্ন তা অনেক আগে থেকেই টের পাচ্ছিলেন অনেকে। এমনিতেই দালাল ধরে সীমান্ত পাড় হয়ে অনেকেই বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে আসেন। সবাই যে বসত করতে আসে তা নয়। অনেক এপাড়ে আসে তাদের আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করতে। মাসখানি কাটিয়ে আবার চলে যায়। পাসপোর্ট বা ভিসা তাদের প্রয়োজন হয় না।

পলক ৩
সোনার গায়ের রঙ সোনার মতো। ঠাম্মা নাম রেখেছিলো সোনা। ডাকনাম ইষ্টিকুটুম।  ঠাম্মা
 সোনাকে বলে - মাগীর শইল্যের রঙ দ্যাখলে পিণ্ডাডা জ্বইল্যা যায়।
সোনা রেগে গিয়ে করিম চাচার কাছে নালিশ জানায় - চাচা!  দ্যাহ না বুড়ি আমারে খালি কী কয়!
-তুই তো আমার সতীন, বুঝলি মাগী!
 সোনা ঠাম্মার অনেক কথা বুজতে পারে না। সে বসে বসে কাঁঠাল পাতা দিয়ে চায়ের কাপ বানায়। আর সেই কাপে বালু ভরতি করে এনে ঠাম্মার হাতে দিয়ে বলে 'এ নেও চা খাও!'
ঠাম্মা ফুঁ দিয়ে দিয়ে চা খায়।
সোনার বাবা দুলাল সবে মাঠ থেকে ফিরেছে। বলদগুলো খড়ের গাদায় বেঁধে দিয়ে লাঙল-জোয়াল গোয়াল ঘরের বেড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখল। সোনারদের বিশাল বড় বাড়ি, উঠানের ওপর দু-দুখানা নারকেল গাছ। দক্ষিণ পাশে বিশাল আকারের খলান। সাড়া বছর ঘরের চালের ভাত খায়। বাড়ির চারপাশটা খেঁজুর গাছে ঘেরা। শীতের সময় সোনার বাবা গাছগুলি পরিস্কার করে মাটির কলসী ঝুলিয়ে দেয়। আবার সকাল হতেই সারি সারি কলসী উঠানে জমা করে। সোনার মা-ঠাম্মা সারা দিন ধরে সেগুলো জ্বাল করে গুড় তৈরি করে। পাড়াপড়শি সবাইকেই দেয়। সোনাদের সারা বছরের বান্ধা কামলা করিম শেখকে দিয়ে গঞ্জের হাটেও পাঠায়। সোনার ঠাম্মা উঠান জুড়ে কাপড়ের ওপর ডালের বড়ি রোদ্দে দেয়। বুড়ি সারা দিন শাক-পাতা ডালের বড়ি, কালোজিরে ধান এসব নিয়েই থাকে। সোনাদের বাড়িতে ধানের স্তুপ পড়েছে। সোনা রঙের ধান আর মেয়ে সোনা যেন দুলালের খুব আপন। কিন্তু  আজ কাল দুলালের মন ভালো নেই। নানা জায়গা থেকে খবর পায় এদেশের হিন্দুরা জমি বাড়ি বিক্রিকে ভারতে পাড়ি দিচ্ছে। দুলালকেও অনেকে ইশারা ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করেছে তারাও যেন দেশ ছেড়ে চলে যায়। আবার দুলালের বাল্যবন্ধুরা ভরসা দেয় - আমরা থাকতে তরে কোথায়ও যাইতে দিমু না।
 দুলালের মা বলে- 'চোখের সামনে দিয়া যহন এতকিছু গেল তহন যাই নাই, এহন আর এই কয়ডা দিনের লাইগ্যা যামু না। মরতে হয় এই বাড়িত মরমু।' এসব শুনে করিম শেখ বলে- 'আম্মা আমি থাকতে আপনেরা এত চিন্তা করেন ক্যান! দেহি না কোন হালায় আহে খেডাইতে। বলছিড়াডা দিয়া গলার মুণ্ডুডা আলগা কইরালামু।'
করিমের মতো অনেক বন্ধুরাই দুলালকে ভরসা দেয়। এক সময় দুলাল তাদের সাথে নদী-নালায় কচ্ছপ খুঁজে বেড়িয়েছে। বিলের জল কমে গেলে মাছ ধরার জন্য সিঙ্গায় ফুঁ দিয়ে লোক জমা করেছে। এসব তার বাল্যস্মৃতি। কিম্তু মাঝে মাঝে তার খুবই ভয় হয়। ভয় হয় সোনাকে নিয়ে। সোনাকে আগলে আগলে বড় করেছে। ইস্কুলে যায়, কতক্ষণ আর তাকে চোখে চোখে রাখবে! দুলালের কাকাতো ভাইগুলো আগেই চলে গিয়েছে। ফোনাফুনিও হয়। তারা বার বার বলে চলে যেতে ভারতে। কিন্তু দুলালও এসব ছেড়ে যেতে চায় না।
পলক ৪
চারপাশের নানা ঘটনা দেখে দেখে দুলালের জন্মভূমির প্রতি মায়া কমে এসেছে। কিছুদিন আগে তাঁর 'চান্দ কপাইল্যা' কালো গাভীখানি মাঠ থেকে হাপিস করে দিয়েছে। অনেক খোঁজাখুজির পরে করিম শেখ খবর এনেছে সিঙ্গিজানী বিলের ওপাড়ের মুসলমান ছেলেরা এ কর্ম করেছে। ওপাড়ের মুরুব্বিদের কাছে নালিস জানিয়ে,  অনেক লড়া-দশার পরও গাভী ফিরিয়ে আানতে পারেনি। তার ওপর  আবার সোনার স্কুলের খগেন মাস্টার চাকরি ছেড়ে দিয়ে একদিন হুট করে ইন্ডিয়া চলে গেল।
এক সময় গাইবান্দা গ্রামে হিন্দু পরিবারের সংখ্যা অধিক ছিল। তারপর কিভাবে এক এক করে সবাই চলে গেল তানিয়ে দুলাল এতদিন মাথা ঘামায় নি। এখন থাকার মধ্যে দুলাল আর তিনটে পরিবার। তবে ওরাও নাকি যাওয়ার জন্য ফাঁক ফোকর খুজঁছে। কিন্তু এ-ত জমি,বাড়ি ফেলে তারা রাতারাতি যেতে পারছে না। দুলাল যতটা ভরসা পায় বন্ধুদের কাছ থেকে বেশি ভয় পায় মেয়ে কে নিয়ে। করিম সোনাকে নিজের মেয়ের চাইতেও বেশি  আদার করে। ছোটবেলা থেকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। কাঁধে বসিয়ে ময়নার মাঠ, শিব রাত্রির মেলা, চৌকিদারের বাড়ির  যাত্রাগান দেখিয়ে এনেছে। এখনও রোজ ইস্কুলে দিয়ে আর নিয়ে আসে। সোনা মাঝে মাঝে বলে,
- তুমি যেমন কর যেন হয় আমি কাইচলা আবু! আমি এহন বড় হইছি না করিম চাচা!
-হ, হইছস। আরও বড় হইতে লাগব। বড় হইয়া ডাক্তার হইতে লাগব।
করিম সোনার কে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখে। তার চোখে সামনে সেই ভয়ঙ্কর রাতের স্মৃতি ভেসে ওঠে। কিছুতেই ভুলতে পারে না সেই দুঃস্বপ্নের রাতের কথা। একজন ডাক্তারে অভাবেই প্রসব যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যুর কোলে ঢুলে পড়ে স্ত্রী হাফিজা। অনেক মানা-সিনা করে, অনেক পীরের তুকতাকে হাফিজা গভর্বতী হয়েছিল। কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারে নি। দ্বিতীয় বার আর বিয়ে করতেও রাজি হয়নি। আর যেদিন করিম দুলালের বাড়িতে  বছর কামলা হয়ে এলো সেদিন অনেক মুসলমান বন্ধু তাকে বলেছে -শালা! হিন্দুগো বাড়িত কামে যাইস না?
করিম এসব শোনে নি। সে দিব্যি বারোটা বছর কাটিয়ে দিল। প্রথম প্রথম দুলােলের পরিবার করিমকে মুসলমান বলেই মনে করত। উঠানের মাঝখানে কলাপাতা কেটে ভাত খেতে দিত। খাওয়ার পর সাত বার গোবর জল ছিটিয়ে জায়গাটা শুদ্ধ করে নিত। তারপর ধীরে কলাপাতা উঠে গিয়ে সিলভারের থালা এলো। একদিন সিলভারের থালাও ফুটো হয়ে গেল। এখন করিম সকলের সাথে বসেই ভাত খায় এমনকী সোনার হাতের মাখা ভাতের দলাও মুখে তুলে নেয়। দুলালে মা বলে - এইডা কী কর করিম? এতডা বালা না।
-সোনা আমার মেয়ার মতো! মেয়ার মাখা খায়ুন যায় না কী! -করিম বলে।

পলক-৫
কিছুদিনের মধ্যে একটা অঘটন ঘটল। দুলালের বিলের পারের জমির সব ধান কেটে নিয়ে গেছে শুধু ন্যাড়া গুলো পড়ে আছে। পাকা ধান সব সাবার করে দিয়েছে!  করিম সকাল সকাল খবর পেয়েই বলছিড়াটা কাঁধে নিয়ে ওপারের মুসলমান বাড়ি গুলিতে গিয়ে শাসিয়ে এসেছে, সন্ধ্যের আগে যেন সব ধান ফিরিয়ে দিয়ে আসে। কিন্তু তাতে কী কাজ হয়! ধান কে নিয়েছে কেউ তা স্বীকার করে না। তাছাড়া এই মরশুমে সকলের খলানে কমবেশি ধানের স্তুপ  পড়ে রয়েছে।
দুলাল মন খারাপ করে বারান্দায় বসে আছে।  ভাবছে, এক কালে হিন্দু আর মুসলমানের কত মিল ছিল! তার বাবার সখা ছিল বিলের ওপারে। যাওয়া আসা লেগেই থাকতো। বিয়া-সাদি-ঈঁদ, সব কিছুতেই। সেইসব দিন কোথায় গেল। মাঝ খানে কে এসে এই হিন্দু ও মুসলমানের ভেতর বিভেদ তৈরি করে দিল!  তাহলে শঙ্কর সাধুর কথাই কি ঠিক? শঙ্কর সাধু একদিন  তার উঠানে দাঁড়িয়ে বলে গেছে - আজ গরু নিয়ে গেছে একদিন ঘর থেকে মেয়ে বউ টেনে নিয়ে যাবে।  বাঁচতে হইলে ভাগ ইণ্ডিয়া!
দুলাল বুঝতে পারে না কী করবে সে। গম্ভীর মুখে ডাকে,
-মা!
- ধান নিছে তাই তর এরম অবস্থা! আমরা কী  না খায়া থাকমু! ঘরে এহনও অনেক ধান আছে। তুই পুলিশের কাছে যায়া একটা নালিশ জানায় আয়। আর তার সঙ্গে ওপারের রহমত মৌল্লার কাছে বিষয়ডা জানায়া আয়। তর বাপের খুব কাছের লোক ছিল হেয়! রান্না ঘর থেকে দুলালে মা জবাব দিল।
রহমত মৌল্লা মুরুবি মানুষ, এক সময় তাকে সবাই খুব মান্য করতো। এখন তার বয়স হয়েছে। বিচার সালিশে বেশি একটা যায় না। তাকে বলে কতটা কী হবে  বুঝতেও পারে না দুলাল।  তবু মায়ের কথা শুনে আরও একবার ওপারে যায়।

পলক-৬
ধান খোয়া গেছে, পুলিশে নালিশ করেও কিছু হয়নি। পুলিশ এসে একবার ঘুরে গেল, আর কয়েক জনের নাম ঠিকানা লিখে নিয়ে গেছে। ব্যস এইটুকু। আর রহমত দুলালকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছে,
- বুজি! সব-ই বুজি বাবা! দ্যাশটা একবারে অ-পাতে গেল। আমি কি করমু ক সে?  বুড়া হইছি, মাইনসে আর মানে না আমারে।
দুলালের  গ্রামের প্রতি টান দিন দিন কমে আসছে। তার বন্ধুদের এখন বন্ধুর চেয়ে বিধর্মী বলেই মনে হয় বেশি। দুলাল সিদ্ধান্ত নেয় সেও দেশ ছাড়বে। কারো কথা শুনছে না, করিমের কথাও না।তার কথা একটাই,
-এইডা আঙ্গর দ্যাশ না! এইডা মুসুরমানের দ্যাশ!


পলক-৭
জলের দরে জমি বিক্রি হয়ে গেল। জমি কেনার গায়ক পাচ্ছিল না দুলাল। অনেক খুঁজে একজনকে পেয়েছে।  সেও জমি  নিতে রাজি হয়েও পিছিয়ে যায়। বলতে গেলে জমি এক রকম লোকটিকে জমি গছিয়ে দিয়েছে দুলাল বাকি বিঘা দুই জমি আর ভিটেখানি করিমের নামে লিখে দিল। কিন্তু সমস্যা হল দুলালের মা কিছুতেই ইণ্ডিয়াতে যেতে রাজি নয়। তার কথা,
- কেডা কইল এইডা মুসুরমানের দ্যাশ? আমার জন্ম এই দ্যাশে। একাত্তুরেও পলায়া আছিলাম না, বডি দিয়া খান সেনা খেদাইছি।  বুকের দুধ ভাগ কইরা পোলাপানরে খাওয়াইছি! হিন্দু মুসুরমান দেহি নাই! এহন খুব রক্ত গরম হইছে।  মুসুরমান মুসুরমান কইরা চিল্লায়। তরা যা আমি যাই তাম না! ইষ্টিকুটুমরেও লইয়া যা..!
কারও সাধ্য নেই দুলালের মাকে এক পা সরায় তার  সিদ্ধান্ত থেকে। তিনি যা বলেন তাই করেন। সোনার কথাও শোনেন না। শেষপযর্ন্ত ঠিক হল দুলাল ইন্ডিয়ায় গিয়ে সব ঠিকঠাক করে এক বছর পরে এসে মাকে নিয়ে যাবেন। ততদিন করিম মায়ের দেখাশোনা করবেন। দহগ্রাম এলাকার দালালকে ধরে ওপারে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কিছুদিন তারা দালালের বাড়িতে গিয়ে থাকবে তারপর দালাল সুযোগ বুঝো সীমান্ত পার করে দেবে।
  পলক-৮
ভিটে  ছেড়ে এসেছে সাতদিন হয়ে গেল। এখনও কোন সুযোগ-সুবিধা হচ্ছে না। দুলালের ইচ্ছে করছে না দেশ ছেড়ে যেতে। যে দেশটাতে ছোটো থেকে বড়ো হয়েছে, ধুলোবালিকাদা লেগে আছে রক্তের ভেতর সেই দেশের মায়া বড়ই কঠিন। তাছাড়া মায়ের কথা বেশি করে মনে পড়ছে, মাকে ছেড়েও কোনোদিন কোথাও যায়নি। সোনাতো ঠাম্মার জন্য সকাল সন্ধ্যা মন খারাপ করে বসে থাকে। মা মরা মেয়ে ঠাম্মার কাছেই মানুষ। করিমের মন সব থেকে খারাপ। মেয়ের মতো দেখে এসেছে সোনাকে। তাই তো এত দূরে ছুটে এসেছে সঙ্গে নিয়ে। সীমান্ত পার না করে দিয়ে সে যাবে না। যতদিনই লাগুক।
এরই মধ্যে ইন্ডিয়া-পাকিস্থানের যুদ্ধের সম্ভবনা দেখা দেওয়ায় সীমান্তে টহল আরও জোরদার হয়েছে। সুযোগ হচ্ছে না।দালালের বাড়ি সীমান্ত থেকে ঢিল ছুড়া দূরত্বে।  দুলাল একদিন দিনের বেলা সীমান্ত ঘুরে সব দেখে এল। শিমুল গাছটাও, যার গায়ের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে কাঁটাতার পেরোতে হবে।
দেখতে দেখতে তো অনেক দিন হয়ে গেল। দুলাল দালালকে জানিয়ে দিল,
-আজ রাইতে যে কইরাই হোক পার হইতেই লাগব।
-ঠিক আছে! কিন্তু এত ঝুঁকি লইয়া যাওয়া কি ঠিক হব।
দুলাল অস্থির হয়ে উঠেছে। দেশ ছাড়ার যন্ত্রণা তাকে কুঁরে কুঁরে খাচ্ছে। তাছাড়া ওপারে সোনার কাকারা এসে অনেকদিন থেকে অপেক্ষা করে আছে। ঘন ঘন খবরও পাঠাচ্ছে।
রাত বাড়তে লাগল। সোনার গায়ে চটের বস্তা জড়িয়ে দিয়ে দুলাল নিজেও কিছু কাপড় জড়িয়ে তৈর হয়ে নিল।  সোনাকে পার করিয়ে দিয়ে করিম ফিরে আসবে। আর দালাল দুলাল ও সোনাকে ওপারের দালালের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসবে।
চারজন! ধীরে ধীরে শিমুল গাছের আড়ালে ছায়ায়  গিয়ে দাঁড়াল। সোনা শিমুল গাছের সিড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে পার  হয়ে গেল। এরপর করিম মাথায় বোচকা নিয়ে ওপরে ওঠতেই পর পর  তিনটে গুলির আওয়াজ। করিম লুটিয়ে পড়ল, দুলালও লুটিয়ে পড়ল, দালাল পালাতে গিয়ে গুলি খেয়ে পড়ে গেল। সোনাকে তার কাকারা নিয়ে পালিয়ে গেল।
পলক-৯
কিছুদিন পরে গাইবান্দা গ্রামে একজোড়া মৃত দেহ এল। দুলালের মা কখনও করিমকে আবার কখনও দুলালকে জড়িয়ে ধরে কাদঁল। গ্রামের মানুষ একজনকে কবর দিল আর একজনকে উঠানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আম গাছটা কেটে জ্বালিয়ে দিল।
এপারে এসে সোনা কয়েকদিন কারো সাথে কথা বলল না। শুধু বাবা আর করিম চাচা বলে চিৎকার করে কাঁদল। সোনাকে যারা দেখে তারাই আফসোস করে - ইস! জন্মের সময় মা-রে হারাইছে এহন বাবা রে হারাইল। কেমনে সহ্য করব!
আর কিছু দিন কাটল। সবাই সোনা কে সোনার মতো যত্ন করে রাখে। কাকারা আবদার মেটায়। ছোটো কাকা গোপাল নতুন জামা এনে দেয়। কিন্তু সোনার মন ভরে না এতেও। সে ঠাম্মাকে এনে দেওয়ার বায়না ধরে ছোটকাকার কাছে। তারপর দিন যত যায় সোনার আদরে তত ভাটা পড়ে। সোনার অঙ্গ রোদে পুড়ে ছাই বর্ণ হতে থাকে। আবারও লোকজন আফসোস করে বলে,
ইস! বাচ্চা মেয়াডারে কাহারা কিভাবে খাডায় রে। দেখলে মায়া লাগে।
এভাবে বছর ঘুরে যায়। অবসর সময়ে সঙ্গীদের সাথে ছোটাছুটি করে আবার সে কাঁঠাল পাতা দিয়ে চায়ের কাপ বানায়, সোনার সঙ্গীরা কাঁঠাল পাতায় ফুঁ দিয়ে চা খায়।
একদিন ছোটো কাকা গোপাল ওপারে গাইবান্দা গ্রামে গিয়ে হাজির হয়।  বর্ষার গাইবান্দা গ্রামের পথঘাট ডুবে রয়েছে। বিল টইটুম্বুর। দুলালের মা ভাত রান্না করছে বারান্দার উনুনে। গোপাল মাকে নিয়ে যাবে তাই মার জন্য তেমন কিছু নিয়ে আসেনি। মায়ের রুক্ষ শীর্ণ চেহারা গোপালকে আশ্চর্য  করে। সে মায়ের এমন অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করে,
মা! তোমার এই অবস্থা ক্যান?
কোন জবাব পায় না গোপাল। মা তাকে থালা ভর্তি ভাত দিলেন  হাঁসের ডিম সেদ্ধ দিয়ে।
ভাত খেতে  খেতে গোপাল মাকে বলে,
-মা তুমি যাইতা না?
-কই?
-ইন্ডিয়া!
- না!
- এহানে কই থাকবা। দুই দিন পরে তো খেদায়া দিব!
- কেডা!
- শেগেরা।
-ক্যা?
- এইডা তো শেগেগোর দ্যাশ।
- কেডা কইল এইডা শেগেগোর দ্যাশ! এই দ্যাশ আমার!
- তুমি একলা একলা থাকবা এহানে?
- একলা না! অনেক মানুষই আছে।
-  কেউ নাই!  সবাই ইন্ডিয়া যাইতাছে গা!
-যাক! আমি যাইতাম না!
গোপালও পারল না তার মাকে রাজি করাতে।দেশে নিয়ে যেতে। যাবার আগে সোনার মৃত মায়ের কিছু জিনিসপত্র গয়না একটি কাপড়ে বেঁধে সোনার জন্য দিয়ে দিলেন। বিদায়ের বেলায় গোপাল আবারও একবার মাকে জোরাজুরি করল মাকে। কিন্তু গোপালের মা যেতে যাবেই না। শুধু  বলল- 'দেহিস, সাবধানে থাহিস। তগরে আবার যাতে বাংলাদেশি কইয়া খেদাইয়া না দেয়।'
- বাংলাদেশী কইলেই হইল? ভুডের কার্ড রেশন কার্ড সব আছে!
- এই দ্যাশেও তো সব ছিল? তাইলে গেলি ক্যা!
গোপাল কিছু উত্তর না দিয়ে আস্তে ধান ক্ষেতের আল ধরে হাঁটতে শুরু করল। গোপালের মা গোপালের দিকে চেয়ে আছে। গোপাল ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছে। লম্বা গোপালের শরীরটা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে সবুজ ধানক্ষেতে মিশে যাচ্ছে। মায়ের চোখ থেকে দুফোটা জল গড়িয়ে পড়ল মাটিতে।...
' দূরে ধান ক্ষেতের  আল ধরে দৌড়ে আসছে সোনা। পিঠে স্কুল ব্যাগ পেছনে করিম আর  দুলাল।'
চোখে মুছতেই  আবার গোপালের অস্পষ্ট শরীরটা চোখে পড়ল। ধীরে মিশে যাচ্ছে সবুজ ক্ষেতে।


                                                                      ******