Tuesday, 21 August 2018

ফণিদার চায়ের দোকানের আড্ডা ২ --- প্রলয় নাগ

ফণিদার চায়ের দোকানের আড্ডায়...
দু'তিন হল বিছানায় শুয়ে আছি।  কলের পাড়ে পড়ে গিয়ে ডান পায়ের বারোটা বাজিয়ে ফেলেছি, কোনও রকমে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটি। দু'দিন বিছানায় পড়ে থেকে আজ আর ভালো লাগছিল না। কোনও রকমে গিয়ে ফণিদার দোকানে গেলাম। ফণিদা আমায় দেখেই বলে উঠলেন-
--- কি রে তুই বাইচ্যা আছিস! আমি তো ভাবসি মরসস!
--- আর কইও না ফণি দা! আর পারতাসি না। খুব ব্যথা! কিছুতে কমসে না।
ফণিদার দোকানে দেখি আজ একটা নতুন আইটেম করেছে। গরম গরম পেঁয়াজি ভেজে থালায় রাখা।  আমি গিয়ে সোজা থালায় হাত দিতেই ফণিদা তেড়ে এল।
--- এই,  র- -- র - র- র। সাবধান থালায় হাত দিবি না! বয়সটা দেখছস তর। এই বয়সে কোন হাত দিয়া কি করস  তার ঠিক আছে! সাবধান।  কি লাগে আমার কাছে চাবি, আমি দিমু।
--- তুমিও পারো ফণিদা!
বলে আমি পেছনে নড়বড়ে বেঞ্চটাতে বসে পড়লাম। ফণিদা সদানন্দবাজারের  রবিবাসরীয়র একটি ছেঁড়া কাগজে কয়েকটা পেঁয়াজি দিল। আমি খেতে খেতে বললাম,
--- ফণিদা দ্যাশের পরিস্থিতিটা ভালা না, বুজলা! কেরলে বন্যা!
--- নিজের পরিস্থিতির কথা আগে চিন্তা করে পরে দ্যাশের-টা ভাবিস। বুজলি! ফণিদার উল্টা সাজেশন।
--- হুম। তবু তো।..... শুনলাম কেন্দ্র ৫০০ কোটি দিল। দেশ বিদেশ থেকে টাকা আসতেসে।
-- জনগনের টাকা জনগনরে দিসে।  ওগুলা ছাড়! তুই কত দিসস আগে শুনি?
--- আমি কত দিমু।  বেকার! তবু একশ' দিলাম।
--- বেকার বেকার কইরা আর কতদিন।  এখন একটু জোয়াল কাঁধে নেও। বাপের ঘাড়ে আর কতদিন বন্দুক রাখবা।  টাকার কথা ছাড়ো। এই বন্যায় কে কত দিতাসে ধুলায় বৃষ্টিতে অন্ধকার। শেয়ার বাজারের মতো তাগর দেখি টাকার অঙ্ক বাড়ে আর কমে। কেউ বিশ লক্ষ দিলে শুনি বিশ কোটি  হইয়া যায় আর কেউ বিশ কোটি দিলে শুনি বিশ লক্ষ। এগুলার খেলা তর আমার কচি মাথায় ঢুকব না। একশ' দিসস এটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাক যে আমি দিসি। তর এই একশ মনে রাখবি একশ কোটির সমান।
--- তুমি কত দিলা?
--- আমি আর কত দিমু! কৌটা কালেশনে আইছিল, বিশ টাকা দিসি।
--- মাত্র বিশ টাকা?
--- তাইলে কত দিমু বিশ কোটি? আমি টাটা, বিড়লা না আম্বানি? শোন যাদের দেওয়ার সামর্থ আছে, একশ' কোটির মানুষের ওপর দিয়া  যাদের বাজার ওঠা নামা করে, সারা জীবন ধরে কামইতাসে তারা চুপ করে বসে আছে। এই সময় তাগরে খুঁইজ্যা পাইতি না। তাদের গায়ে এহন বাতাস লাগবো না।  বুজলি, আর আমি তো সামন্য চা-ওয়ালা।
--- চা-ওয়ালা সামান্য কে বলল? চা-ওয়ালাই তো দ্যাশের ভবিষ্যৎ!
--- শোন রাজনীতির কথা ছাড়! সেনা বাহিনীদের দেখ? কি ভাবে কাজ করতাসে। এই সময় টাকা দিয়া কি হবো। জীবন মরণ এক কইরা মানুষ বাচাইতাসে। এরাই দ্যাশের ভবিষ্যৎ। এক সেনা দুই শ্রমিক আর কৃষক। বাকিরা সব শোষক।
--- আর শিক্ষক?
--- শিক্ষকরা তো জাতীর মেরুদণ্ড!
............................................
বিপর্যয় তো বলে কয়ে আসে না। সেখানে রঙিন  রাজনীতির খেলা না খেলাই বরং ভালো।  মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও,
মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও,
মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।
তোমাকে সেই সকাল থেকে তোমার মতো মনে পড়ছে,
সন্ধে হলে মনে পড়ছে, রাতের বেলা মনে পড়ছে।
মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও,
এসে দাঁড়াও, ভেসে দাঁড়াও এবং ভালোবেসে দাঁড়াও,
মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও। (শক্তি চট্টোপাধ্যায়)



ফণিদার চায়ের দোকানের আড্ডায়. ১-- প্রলয় নাগ

#ফণি-দার চায়ের দোকানের আড্ডায়...

সন্ধ্যায় প্রতিদিন ফণি-দার চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেই। যোগেন, হরি, নকুল এরা সকলেই আসে।  আমি যেতেই ফণি-দা এক কাপ চা দিলেন। চায়ে চুমুক দিয়েই দেখি মিষ্টি খুব বেশি।
--- এত মিষ্টি কেন?
--- আরে একটু  খা। কিসু হবে না।  কত দিন আর বাঁচবি। খায়া মর।--- ফণিদা বললেন।
--- তা ঠিক খাইয়াই মরি!
--- দেখছস চার পাশে কত লোক মরছে। আজ অমুক লেখক কাল তমুক মন্ত্রী। একদিন দেখবি এই ফণিদাও নেই! জীবনে কিছুই করতে পারলাম না!
--- মোড়ের মাথা এত জমজমাট চায়ের দোকান--- এটা কম কী?  সবাই কত ভালোবাসে তোমায়! --- হরি বলল।
--- হুম। ভালোবাসে কিন্তু বাকি পইসাগুলো তো দেয় না।
-- দেবে দেবে!
--- মরলে পরে দেবে!
--- তুমি এতো সহজে মরবা না। তোমাকে আমরা মরতে দেব না।---  যোগেন কথা শেষ করেই ফণি- দাকে দু'হাতে কোলেই তুলে নিল।
--- নামা! নামা!  নামা কইতাসি। এত পীড়িত দেখাইতে লাগবো না। বাকি পইসাগুলা দিস! তাইলেই হবে।
আমরা সবাই এটা দেখে  হাসতে লাগলাম। আমি বললাম:
--- ফণিদা তুমি মরলে আমরা দৈনিক কাগজের প্রথম পাতায় খবর ছাপাবো। হেড লাইন হবে 'আমাদের ফণিদার মহাপ্রয়াণ'। তারপর শোক বাক্যে পাতা ভরিয়ে তুলব।
---  ক্যান? আমি বাইচ্যা থাকতে কী আঁটি বানলাম যে মইরা গেলে মহাপুরুষ হমু? ওই সব দালালিগিরি প্রয়োজন নাই। তরা কী ভারতীয় মিডিয়া?
--- আমরা তোমায় ভালোবাসি!  এইটুক তো করতেই পারি!
ফণি-দা আবার শুরু করলেন:
--- শোন বইচ্যা থাকইক্যা যদি ভালো কাজ করতে না পারিস তবে মইরা স্বর্গ যাবি আশা করিস না। এই যে লুইচ্যা সুনীল কয়েকদিন আগে মরল। সবার কি দুঃখ! ও কেউ রে শান্তি দিসে বাইচ্যা থাকতে? মরার পরে এত আবেগ দেখায়া লাভ নাই। এই যে  ভারতের দক্ষিণে পশ্চিমে এতো বড়ো বড়ো সাগর মহাসাগর--- কারণ কী জানস? ভারতবাসীর আবেগ। আর এই আবেগের  জল গঙ্গা- ব্রহ্মপুত্র-গোদাবরী দিয়া  নামে ওই সাগরে জমা হয়। আর বাঙালির কথাতো কইস না! বাঙালির এতো আবেগ সামাল দেওয়ার জন্যেই বাংলায় এতো নদ- নদী। সব জল জমা হয় বঙ্গোপসাগরে। বুঝলি!
--- তাহলে  তুমি কও মানুষ মরলে কাঁদমু না?-- যোগেনের জিজ্ঞাসা।
--- একশ' বার কাদঁবি, কিন্তু ভালা মানুষের জন্য।
--- তুমি মরলে?--- আমি প্রশ্ন করলাম।
--- আমি তো মরা-ই।  আর মরমু কেমনে?