Monday, 3 July 2017

কাকতাড়ুয়ার গল্প -২ প্রেম পর্ব


।। প্রলয় নাগ।।

লোকে বলে কাকতাড়ুয়াকে তার বাপে কুড়িয়ে পেয়েছে । বাপ মুড়ি বিক্রি করত ট্রেনে ট্রেনে। এক ঝড় বাদলে রাতে কাকতাড়ুয়াকে বাড়িতে নিয়ে আসে।সৎমা কাকতাড়ুয়াকে মেনে নিতে পারেনি তুমুল ঝগড়া হয় বাপ মায়ে। কাকতাড়ুয়ার ভাগ্যে  যশোদার মতো মা জুটল না আর কি! কাকতাড়ুয়ার কোন আক্ষেপ নেই। থাকবে কোত্থেকে, তখনও তার বোঝার বয়সটি হয়নি।
কিছুদিন পরে বাপ মরল সাপের কামড়ে বাপ মারা যেতেই সৎমা চার বছরের কাকতাড়ুয়া ফেলে এক পিয়াজের ব্যাপারীর সঙ্গে হাঙ্গা করে চলে আসে ধুবড়িতে সেইদিন ফেলে আসা শণের ঘরে কাকতাড়ুয়া বসে খুব কাঁদছিল, কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়ে তারপর কতজনের কতকি- মুড়ি, চালভাজা, ভাতের ফ্যান, বাসিপান্তা খেয়ে খেয়ে বড় হয়ে গেললোকের ধান গম বেগুন ক্ষেতে তেলের টিন বাজিয়ে বাজিয়ে কাকপক্ষী তাড়াতে তাড়াতে নাম হয়ে গেল কাকতাড়ুয়া এখন  নিউ জলপাইগুড়ি – নিউ বঙ্গাইগাও লোকালে মুড়ি চানা বিক্রি করে আরমাঝেমাঝে কুষানযাত্রার পালাতে বাঁশের বাঁশিবাজায় মাসে এক-আধ বার বাড়ি আসলে আসে, আর না হলে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের পাশে বস্তিতে এক বিধবার সাথে রাতে থেকে যায়
         কাকতাড়ুয়ার মনে আসে তার পুরনো দিন গুলির কথা হকার বন্ধুদের কাছে আক্ষেপ করে –‘ইস এখন যদি পাইতাম’ ট্রেনে চলতে অনেক মেয়েকেই সে দেখে  সব মেয়েকে তার  বোন-মা বলে মনে হয় না অনেককে দেখে চোখের সামনে তার অতীত জীবনটি ভেসে ওঠে তখন সে মুড়ির বাক্স নামিয়ে দরজা রেলিংয়ে ধরে   বুকের বোতাম খুলে দিয়ে বাতাস লাগিয়ে শরীর ঠাণ্ডা করে
 সব কথা তার মনেও নেই তার চেয়ে বয়সে বড় ধাড়ি ধাড়ি মেয়ে গুলো তাকে ডেকে নিয়ে যেত পাট ক্ষেতে বা নদীর চরে গরু চরাতে তারা নির্দ্বিধায় জামা খুলে ফেলত তার সমানে বলত- ‘সুড়সুড়ি দে’ ওসব  তখন সে কিছু বুজত না, ভাবতো এও বুঝি রান্নাবাটির মতো কোন খেলা 
একসময় ধীরে ধীরে কাকতাড়ুয়া সব বুঝতে শেখেএখন আর তাকে কেও ডেকে নিয়ে যায় না শীতের সকালে টিন বাজিয়ে কাক তাড়াতে ফ্রক পড়া মেয়েদের ডাকলেও আর তার কাছে আসে না
কাকতাড়ুয়া  জানে না প্রেম কী ? সে শুধু এই খেলাটাই জানত তার বিশ্বাস হয়ে গেছে প্রেম মানে ছোট বেলায় শেখা  এই খেলাটাই অনেক খেলেছে ও,   অনেককে দেখেছে এই খেলা খেলতে তার মাকেও দেখেছে বাবা বাড়িতে না থাকলে মদনের সাথে এই খেলা খেলছে হিরুয়াকে দেখেছে তার বৌ থাকা সত্ত্বেও ধান ক্ষেতে নিখিলার বৌয়ের সাথে ওই খেলা খেলছে
কাকতাড়ুয়ার মনে কি হয় না হয় সে বলতে পারে না গুছিয়ে একদিন এক বিকেলে পাশের বাড়ির লক্ষ্মীকে সে বলেছিল – ‘তুই আমার লগে পেম করবি?’ লক্ষী  চিৎকার করে তার মাকে বলে দেয়কাকতাড়ুয়ার কপালে জোটে ঝাঁটা জুতা তার পর থেকে সে ভয়ে কাওকে কিছু বলে না এর কিছুদিন পড়ে লক্ষ্মী ভরা পুকুরে পা পিছলে পরে গিয়ে ডুবে মরছিল কাকতাড়ুয়া জল খেতে খেতে বাঁচিয়েছেতারপর থেকে লক্ষ্মী-কাকতাড়ুয়ার একটা ভাব জমে উঠেছিল এসব দেখতে পেয়ে কম বয়সী মেয়েটাকে  জোড় করেই বিয়ে দিয়ে দেয় লক্ষ্মীর বাপ মাকাকতাড়ুয়ার মন খারাপ কিছুদিন কোথায় চলে গেছিল কেউ জানে না কিছু দিন পরে আবার ফিরে এলো গ্রামে 
  কাকতাড়ুয়াকে যারা প্রেম শিখিয়েছে তাদের সকলেরই  বিয়ে হয়ে গেছে কারো তো দু’তিনটে ছাওয়া পুয়াও হয়ে গেছে তাদের সাথে হঠাৎ দেখা হলে কাকতাড়ুয়া হাসি হাসি মুখ করলেও তারা যেন চেনেই না কাকতাড়ুয়াকে এমন ভান কাকতাড়ুয়ার মনে  প্রথম প্রথম একটু কষ্ট লাগলেও পরে সব সয়ে গেছে
কাকতাড়ুয়ার জীবনে একবার প্রেম এসেছিল তখন সে উনিশ কি কুড়ি  হবে চড়া রোদে ধান বাঁধতে বাঁধতে ক্লান্ত হয়ে ক্ষেতের পাশে বননাইল্যা গাছের নিচে বসে বিশ্রাম করছে পাশে  সুটকার জোয়ান বিধবা বৌ-টাও এসে বসল জল খাওয়াল কাকতাড়ুয়াকে তেষ্টায় কাতর কাকতাড়ুয়ার মনে হল এমন আদর করে কেউ কোন দিন তাকে জল খাওয়ায়নি
কাকতাড়ুয়ারও মনে হয় পছন্দ  হয়েছিল বৌ-টাকেতা না হলে সে দিন সন্ধ্যা বেলা গিয়ে হাজির হলই বা কেন তার বাড়িতে তারপর রোজ রোজ সন্ধ্যা  হলেই কাকতাড়ুয়ার আর দেখা পাওয়া না গল্পগুজব হাসিঠাট্টা রমরমা চলছে এরই মধ্যে দু’জনে একদিন নীলকুঠির মাঠে জ্যোতি বসুর জনসভাও করে এসেছে
 এর কিছুদিন পর কাকতাড়ুয়া ধরা পড়ল খড়ের গাদায় জোয়ান বৌটার সাথে পাড়াপড়শিরা মারধোর করে  কাকতাড়ুয়ার নাক মুখ ফাটিয়ে গ্রাম ছাড়া করল দু’দিন পরে বৌটিও বাড়ি ছেড়ে চলে গেল এ ঘটনার পর থেকে কাকতাড়ুয়ার গ্রামের প্রতি টান চলে গেছে আসলে আসে, না এলে বিধবা বৌটির সঙ্গে পড়ে থাকে স্টেশনের বস্তিতে আর জ্যোৎস্না রাতেবাঁশি বাজায়, গলা ছেড়ে গান ধরে –
‘সাধের জনম মাটি হইয়া গেল রে
প্রেম কইরাছি অবুজ বয়সে
প্রেম কারে কয় বুঝি নাই রে
সাধের জনম মাটি হইয়া গেল রে

~~~~~~~~~০০০~~~~~~~~~~~~~q

কাকতাড়ুয়ার গল্প -১


  ।। প্রলয় নাগ।।


 মাথাভাঙ্গা শহরে ঢুকতেই সুটুঙ্গা নদীর ওপর আব্বাসউদ্দিন আহমেদ সেতুসেতু পার করেই বা পাশে একটা পৌরসভার তৈরি করা পেচ্ছাবখানাতাড়াহুড়োর মাঝে সবাই এখানে চটজলদি কাজ সেরে নেয় আর সমস্ত পেচ্ছাবের ধারা গড়িয়ে কি সুটুঙ্গায় মেশে না-কি অন্য কোথাও যায় কেউ জানে না এই সেতু নিচে বছর ২১শের  ভেসে আসা এক যুবতী মেয়ের মড়াকে নিয়ে বেশ তোড়-জোড় শুরু হয়েছে  কবে ভেসে এসে এটা আটকে গেছে কেউ জানে নাআসলে কয়েক দিন পুজোর জন্য সবাই ব্যস্ত ছিল হয়তো   
সকাল সকাল কতগুলো জেলে ঠ্যালা জাল নিয়ে মাছ ধরতে এসে মড়াখানি আবিষ্কার করেছে তবে জেলেরা খুঁজে না পেলেও আজ সবাই টের পেয়ে যেত গন্ধ একটু আধটু বেড়তে শুরু করেছে কাকের উপদ্রবও বাড়তে শুরু করেছিল পেচ্ছাবখানার ওপরে বসে কাকগুলি কা-কা কা-কা করেছে মড়ার দিকে চেয়ে মনে হচ্ছেওদের ভাগের ধন অন্যকেউনিয়ে যাবে
আব্বাসউদ্দিন সেতুর ওপর মানুষের ভিড় জমে গেছে  বুড়া-ছুড়া সকলে মড়া দেখছে হা হুতোস করছে ভাগা পান  বিক্রি করা এক বুড়ি - ‘কত সুন্দর ফুলের মতো মাইয়াডা, এইডা কেমন কইরা  হইল?’ রিবন সানগ্লাস-পড়া ছোকরাদের মধ্যে কেউ বলছে- ‘মালটা খাসা ছিল রে উমমমু ছ্যাকাট্যাকা খাইছে হয়তো
পাশে নদীর ওপারে অভিজাত শ্মশান তার সাথে আর মা কালীর অধিষ্ঠান রোজ কেউ না কেউ পুড়ছে ওখানে
ঘণ্টা দু’য়ে-কের চেষ্টায় মড়াখানি নদী থেকে তুলে নিয়ে গেল পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য মৃতের চোখ দুটি হা-করে খুলেছিল আকাশের দিকে ঠ্যালা গাড়ি থেকে বাড় নেমে যাচ্ছিল  নীল বড়-পলিথিনে জড়িয়ে গুম ঘরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে শহরের মাঝখানে গুম ঘর পাশে বিশাল বড় কাঠালি-বট গাছ হাজার হাজার চাম বাদুর ঝুলে থাকে তার নিচে স্বাস্থ্য-দপ্তরের অফিস। দিনের বেলায় যেতে ভয় লাগে ওই পথ দিয়ে যে ঠ্যালায় করে মড়াখানি শহরের মধ্যে নিয়ে আসা হল সে ঠ্যালায় করে কিছুদিন আগের এক ছোকরাকে নিয়ে আসা হয়েছিল ছোকরার বিয়ে ঠিক হয়ে ছিল কিন্তু শরীরে ছিল সিফিলিস বা গনোরিয়া জাতীয় রোগ ছোকরাটিও ফাঁসি দিয়ে মরে, নিজের পরনের শার্ট দিয়ে
পরদিন খবরে কাগজে বড় বড় করে লেখা ‘যুবতী মেয়ের দেহ উদ্ধার ও গুম ঘর থেকে উধাও’ ছবিও ছেপে ছিল, সাথে দু’এক ছেলে ছোকরার ছবিখবরের কাগজে ছবি দেখে তাদের আনন্দে আর ধরে না
পুলিশ প্রশাসনের ঘাম ছুটে যাচ্ছে মড়া খুঁজতে খুঁজতে  এস.পি স্বয়ং খুঁজতে বেড়িয়েছে মড়া খানিঅতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী নিয়োগ হয়েছে যে করেই  হোক মড়া খুঁজে বেড় করতে হবে লাল-বাজার থেকে ঘন ঘন ফোন আসছে টিভি চ্যানেল গুলিতে ঘুরে ফিরে মড়ার খবর সন্ধ্যায় কি সব তর্কের আসরও বসেছে এই মড়াকে নিয়ে
শহর ভয়ে জর সড় কত আজগুবি গল্প কে নাকি দেখেছে মড়াটি শহরের বটগাছটিতে বসে বাদুরের সাথে গল্প করেছে আর স্বাস্থ্যদপ্তরে ঢিল ছুড়ছে কেউ মড়াটিকে সরকারি বাস-স্ট্যান্ডে ভেতরে শুয়ে থাকতে দেখছে কেউ মড়াটিকে নাকি এলআইসি অফিসে টাকার কিস্তি জমা করতে দেখছে এক বেকার ছেলে দেখেছে মড়াটি নাকি ভিড় ঠেসে এসএসসি-র ফর্ম তুলেছে পোস্ট থেকে কেউ বলছে মড়াটি নাকি সঙ্গীদের সাথে দল বেঁধে অপ্সরা হলে সিনেমা  দেখেছে কেউ  মড়াটিকে সন্ধ্যা বেলা পিট ব্যাগ নিয়ে টিউশন পড়ে বাড়ি ফিরতে দেখেছে কেউ মনীষী পঞ্চানন বর্মার মূর্তিটিতে ফুল দিতে দেখছে কেউ বলছে – ‘দুর্- এ হল ঢপের চপ গুম ঘর থেকে হয়ত শেয়ালে টেনে নিয়ে গেছে
 কিন্তু কোথায় মড়া ?
কেউ খুঁজে পাচ্ছ না গুম ঘরের লোকটিকে স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোকেরা দু’দিন থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চলেছে বেচারা কীভাবে জানবে? সে তো শুধু ঘরের তালাচাবি লাগায় আর খোলে
মড়া নিয়ে আন্দোলন হবে বিরোধীরা হুমকি দিয়েছেবিধান সভা ওয়াক আউট করেছেদক্ষিণী বুদ্ধিজীবীরা উত্তরে এসেছে মড়া খুঁজতে
মড়া পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও সরকার ঘোষণা করেছে মড়া খুঁজে দিলে দু’ লাখ
রাজা থেকে প্রজা সবাই মড়া খুঁজতে বেড়িয়েছে  ‘মড়া কোথাও নেই, তবে গেল কোথায়?’ – সকালে চায়ের দোকানের আসরে প্রশ্ন উঠছে

কিছুদিন মড়া পাওয়া গেল। হৈ হৈ রব উঠেছে চারদিকে। ধরলা নদীতে যুবতী মেয়ের মড়া। সবাই হন্যে হয়ে ছুটছে মড়া দেখতে । আকাশে বগি উড়তে উড়তে বগাকে বলে-‘এই বুঝি সেই মড়া।’ বগা বলে-‘না, এ মড়া সে মড়া নয়।’
এক বড় নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যদিয়ে গুমঘরে আনা হল এ মেয়েটির মড়াকেও। বড় বড় অফিসার পাহারায় নিযুক্ত। প্রশাসন বলছে –‘দেখি এবার মড়া কোথায় যায়?’
পর দিন খবরে কাগজে ‘আবার মড়া উধাও’  গুম ঘরের লোকটিকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ লাঠি ডাণ্ডা। লোকটির একি কথা-  ‘আমি কি জানি? আমি তো শুধু তালা লাগাই আর খুলি। মড়া কই কীভাবে কমু?’
                                 ……………………………………………………………….

অনুপ্রবেশ- প্রলয় নাগ

অনুপ্রবেশ
প্রলয় নাগ

পলক ১
-এক!
-ওই যে আরেকটা ছায়া!
-দুই!
-ওই দেখো পেছনে আরেকজন মাথায় বোচকা নিয়ে পাড় হচ্ছে !
- তার মানে তিন জন!
 - ওরাই হবে। চলো আমারাও এগোই।
তিন জন লোক গাছে থেকে নেমে ধীরে ধীরে কাঁটাতারের পাশে বড় শিমুল গাছটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। শিমুল গাছটা ঠিক কাঁটাতারের ঘেসে আকাশমুখী হয়ে উঠেছে। শিমুল গাছটা ওসব কাঁটাতার ফাটাতারের তোয়াক্কা করে না। দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। কে বা কারা যেন শিমুল গাছটা কেটে সিঁড়ি বানিয়েছে। রাত বি-রাতে যে লোক সীমান্ত পাড় হয় শিমুল গাছটাই তার সাক্ষী। প্রথমে একজন পাড় হয়ে এপারের  দলটার সাথে মিশে গেল।
হঠাৎ 'ফায়ার...!'

পলক ২
পরদিন খবরের কাগজে হেড লাইন- 'ভারত-পাক যুদ্ধের সূচনা।' পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে তিন জন ভারতীয় সেনা শহীদ হয়েছে। আর তার পাশে একোণে ছোট্ট করে ছাপা হয়েছে ' ঋণে জর্জরিত হয়ে কৃষকের আত্মহত্যার সংখ্যা দাঁড়াল ২৪'! কিন্তু সে খবরে কারও চোখ নেই। সবাই যুদ্ধ নিয়েই মেতে আছে। সকালে গরম চায়ের সঙ্গে বিস্কুট ভিজিয়ে খেতে খেতে যুদ্ধের খবর পড়ে সবাই। এক ফাকে বিস্কুট ভেঙেও চায়ের কাপে পরে যায়। আর হা-হুতাশ করে- 'দে পাকিস্থানরে গুড়ায়া! শালা তুরুখের দ্যাশ।
খবরের কাগজের তৃতীয় পাতায় ছাপা হয়েছে গত রাতের ঘটনাটি। সীমান্তে নিহত দুই অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি। যুদ্ধ পরিস্থিতি যে আসন্ন তা অনেক আগে থেকেই টের পাচ্ছিলেন অনেকে। এমনিতেই দালাল ধরে সীমান্ত পাড় হয়ে অনেকেই বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে আসেন। সবাই যে বসত করতে আসে তা নয়। অনেক এপাড়ে আসে তাদের আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করতে। মাসখানি কাটিয়ে আবার চলে যায়। পাসপোর্ট বা ভিসা তাদের প্রয়োজন হয় না।

পলক ৩
সোনার গায়ের রঙ সোনার মতো। ঠাম্মা নাম রেখেছিলো সোনা। ডাকনাম ইষ্টিকুটুম।  ঠাম্মা
 সোনাকে বলে - মাগীর শইল্যের রঙ দ্যাখলে পিণ্ডাডা জ্বইল্যা যায়।
সোনা রেগে গিয়ে করিম চাচার কাছে নালিশ জানায় - চাচা!  দ্যাহ না বুড়ি আমারে খালি কী কয়!
-তুই তো আমার সতীন, বুঝলি মাগী!
 সোনা ঠাম্মার অনেক কথা বুজতে পারে না। সে বসে বসে কাঁঠাল পাতা দিয়ে চায়ের কাপ বানায়। আর সেই কাপে বালু ভরতি করে এনে ঠাম্মার হাতে দিয়ে বলে 'এ নেও চা খাও!'
ঠাম্মা ফুঁ দিয়ে দিয়ে চা খায়।
সোনার বাবা দুলাল সবে মাঠ থেকে ফিরেছে। বলদগুলো খড়ের গাদায় বেঁধে দিয়ে লাঙল-জোয়াল গোয়াল ঘরের বেড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখল। সোনারদের বিশাল বড় বাড়ি, উঠানের ওপর দু-দুখানা নারকেল গাছ। দক্ষিণ পাশে বিশাল আকারের খলান। সাড়া বছর ঘরের চালের ভাত খায়। বাড়ির চারপাশটা খেঁজুর গাছে ঘেরা। শীতের সময় সোনার বাবা গাছগুলি পরিস্কার করে মাটির কলসী ঝুলিয়ে দেয়। আবার সকাল হতেই সারি সারি কলসী উঠানে জমা করে। সোনার মা-ঠাম্মা সারা দিন ধরে সেগুলো জ্বাল করে গুড় তৈরি করে। পাড়াপড়শি সবাইকেই দেয়। সোনাদের সারা বছরের বান্ধা কামলা করিম শেখকে দিয়ে গঞ্জের হাটেও পাঠায়। সোনার ঠাম্মা উঠান জুড়ে কাপড়ের ওপর ডালের বড়ি রোদ্দে দেয়। বুড়ি সারা দিন শাক-পাতা ডালের বড়ি, কালোজিরে ধান এসব নিয়েই থাকে। সোনাদের বাড়িতে ধানের স্তুপ পড়েছে। সোনা রঙের ধান আর মেয়ে সোনা যেন দুলালের খুব আপন। কিন্তু  আজ কাল দুলালের মন ভালো নেই। নানা জায়গা থেকে খবর পায় এদেশের হিন্দুরা জমি বাড়ি বিক্রিকে ভারতে পাড়ি দিচ্ছে। দুলালকেও অনেকে ইশারা ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করেছে তারাও যেন দেশ ছেড়ে চলে যায়। আবার দুলালের বাল্যবন্ধুরা ভরসা দেয় - আমরা থাকতে তরে কোথায়ও যাইতে দিমু না।
 দুলালের মা বলে- 'চোখের সামনে দিয়া যহন এতকিছু গেল তহন যাই নাই, এহন আর এই কয়ডা দিনের লাইগ্যা যামু না। মরতে হয় এই বাড়িত মরমু।' এসব শুনে করিম শেখ বলে- 'আম্মা আমি থাকতে আপনেরা এত চিন্তা করেন ক্যান! দেহি না কোন হালায় আহে খেডাইতে। বলছিড়াডা দিয়া গলার মুণ্ডুডা আলগা কইরালামু।'
করিমের মতো অনেক বন্ধুরাই দুলালকে ভরসা দেয়। এক সময় দুলাল তাদের সাথে নদী-নালায় কচ্ছপ খুঁজে বেড়িয়েছে। বিলের জল কমে গেলে মাছ ধরার জন্য সিঙ্গায় ফুঁ দিয়ে লোক জমা করেছে। এসব তার বাল্যস্মৃতি। কিম্তু মাঝে মাঝে তার খুবই ভয় হয়। ভয় হয় সোনাকে নিয়ে। সোনাকে আগলে আগলে বড় করেছে। ইস্কুলে যায়, কতক্ষণ আর তাকে চোখে চোখে রাখবে! দুলালের কাকাতো ভাইগুলো আগেই চলে গিয়েছে। ফোনাফুনিও হয়। তারা বার বার বলে চলে যেতে ভারতে। কিন্তু দুলালও এসব ছেড়ে যেতে চায় না।
পলক ৪
চারপাশের নানা ঘটনা দেখে দেখে দুলালের জন্মভূমির প্রতি মায়া কমে এসেছে। কিছুদিন আগে তাঁর 'চান্দ কপাইল্যা' কালো গাভীখানি মাঠ থেকে হাপিস করে দিয়েছে। অনেক খোঁজাখুজির পরে করিম শেখ খবর এনেছে সিঙ্গিজানী বিলের ওপাড়ের মুসলমান ছেলেরা এ কর্ম করেছে। ওপাড়ের মুরুব্বিদের কাছে নালিস জানিয়ে,  অনেক লড়া-দশার পরও গাভী ফিরিয়ে আানতে পারেনি। তার ওপর  আবার সোনার স্কুলের খগেন মাস্টার চাকরি ছেড়ে দিয়ে একদিন হুট করে ইন্ডিয়া চলে গেল।
এক সময় গাইবান্দা গ্রামে হিন্দু পরিবারের সংখ্যা অধিক ছিল। তারপর কিভাবে এক এক করে সবাই চলে গেল তানিয়ে দুলাল এতদিন মাথা ঘামায় নি। এখন থাকার মধ্যে দুলাল আর তিনটে পরিবার। তবে ওরাও নাকি যাওয়ার জন্য ফাঁক ফোকর খুজঁছে। কিন্তু এ-ত জমি,বাড়ি ফেলে তারা রাতারাতি যেতে পারছে না। দুলাল যতটা ভরসা পায় বন্ধুদের কাছ থেকে বেশি ভয় পায় মেয়ে কে নিয়ে। করিম সোনাকে নিজের মেয়ের চাইতেও বেশি  আদার করে। ছোটবেলা থেকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। কাঁধে বসিয়ে ময়নার মাঠ, শিব রাত্রির মেলা, চৌকিদারের বাড়ির  যাত্রাগান দেখিয়ে এনেছে। এখনও রোজ ইস্কুলে দিয়ে আর নিয়ে আসে। সোনা মাঝে মাঝে বলে,
- তুমি যেমন কর যেন হয় আমি কাইচলা আবু! আমি এহন বড় হইছি না করিম চাচা!
-হ, হইছস। আরও বড় হইতে লাগব। বড় হইয়া ডাক্তার হইতে লাগব।
করিম সোনার কে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখে। তার চোখে সামনে সেই ভয়ঙ্কর রাতের স্মৃতি ভেসে ওঠে। কিছুতেই ভুলতে পারে না সেই দুঃস্বপ্নের রাতের কথা। একজন ডাক্তারে অভাবেই প্রসব যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যুর কোলে ঢুলে পড়ে স্ত্রী হাফিজা। অনেক মানা-সিনা করে, অনেক পীরের তুকতাকে হাফিজা গভর্বতী হয়েছিল। কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারে নি। দ্বিতীয় বার আর বিয়ে করতেও রাজি হয়নি। আর যেদিন করিম দুলালের বাড়িতে  বছর কামলা হয়ে এলো সেদিন অনেক মুসলমান বন্ধু তাকে বলেছে -শালা! হিন্দুগো বাড়িত কামে যাইস না?
করিম এসব শোনে নি। সে দিব্যি বারোটা বছর কাটিয়ে দিল। প্রথম প্রথম দুলােলের পরিবার করিমকে মুসলমান বলেই মনে করত। উঠানের মাঝখানে কলাপাতা কেটে ভাত খেতে দিত। খাওয়ার পর সাত বার গোবর জল ছিটিয়ে জায়গাটা শুদ্ধ করে নিত। তারপর ধীরে কলাপাতা উঠে গিয়ে সিলভারের থালা এলো। একদিন সিলভারের থালাও ফুটো হয়ে গেল। এখন করিম সকলের সাথে বসেই ভাত খায় এমনকী সোনার হাতের মাখা ভাতের দলাও মুখে তুলে নেয়। দুলালে মা বলে - এইডা কী কর করিম? এতডা বালা না।
-সোনা আমার মেয়ার মতো! মেয়ার মাখা খায়ুন যায় না কী! -করিম বলে।

পলক-৫
কিছুদিনের মধ্যে একটা অঘটন ঘটল। দুলালের বিলের পারের জমির সব ধান কেটে নিয়ে গেছে শুধু ন্যাড়া গুলো পড়ে আছে। পাকা ধান সব সাবার করে দিয়েছে!  করিম সকাল সকাল খবর পেয়েই বলছিড়াটা কাঁধে নিয়ে ওপারের মুসলমান বাড়ি গুলিতে গিয়ে শাসিয়ে এসেছে, সন্ধ্যের আগে যেন সব ধান ফিরিয়ে দিয়ে আসে। কিন্তু তাতে কী কাজ হয়! ধান কে নিয়েছে কেউ তা স্বীকার করে না। তাছাড়া এই মরশুমে সকলের খলানে কমবেশি ধানের স্তুপ  পড়ে রয়েছে।
দুলাল মন খারাপ করে বারান্দায় বসে আছে।  ভাবছে, এক কালে হিন্দু আর মুসলমানের কত মিল ছিল! তার বাবার সখা ছিল বিলের ওপারে। যাওয়া আসা লেগেই থাকতো। বিয়া-সাদি-ঈঁদ, সব কিছুতেই। সেইসব দিন কোথায় গেল। মাঝ খানে কে এসে এই হিন্দু ও মুসলমানের ভেতর বিভেদ তৈরি করে দিল!  তাহলে শঙ্কর সাধুর কথাই কি ঠিক? শঙ্কর সাধু একদিন  তার উঠানে দাঁড়িয়ে বলে গেছে - আজ গরু নিয়ে গেছে একদিন ঘর থেকে মেয়ে বউ টেনে নিয়ে যাবে।  বাঁচতে হইলে ভাগ ইণ্ডিয়া!
দুলাল বুঝতে পারে না কী করবে সে। গম্ভীর মুখে ডাকে,
-মা!
- ধান নিছে তাই তর এরম অবস্থা! আমরা কী  না খায়া থাকমু! ঘরে এহনও অনেক ধান আছে। তুই পুলিশের কাছে যায়া একটা নালিশ জানায় আয়। আর তার সঙ্গে ওপারের রহমত মৌল্লার কাছে বিষয়ডা জানায়া আয়। তর বাপের খুব কাছের লোক ছিল হেয়! রান্না ঘর থেকে দুলালে মা জবাব দিল।
রহমত মৌল্লা মুরুবি মানুষ, এক সময় তাকে সবাই খুব মান্য করতো। এখন তার বয়স হয়েছে। বিচার সালিশে বেশি একটা যায় না। তাকে বলে কতটা কী হবে  বুঝতেও পারে না দুলাল।  তবু মায়ের কথা শুনে আরও একবার ওপারে যায়।

পলক-৬
ধান খোয়া গেছে, পুলিশে নালিশ করেও কিছু হয়নি। পুলিশ এসে একবার ঘুরে গেল, আর কয়েক জনের নাম ঠিকানা লিখে নিয়ে গেছে। ব্যস এইটুকু। আর রহমত দুলালকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছে,
- বুজি! সব-ই বুজি বাবা! দ্যাশটা একবারে অ-পাতে গেল। আমি কি করমু ক সে?  বুড়া হইছি, মাইনসে আর মানে না আমারে।
দুলালের  গ্রামের প্রতি টান দিন দিন কমে আসছে। তার বন্ধুদের এখন বন্ধুর চেয়ে বিধর্মী বলেই মনে হয় বেশি। দুলাল সিদ্ধান্ত নেয় সেও দেশ ছাড়বে। কারো কথা শুনছে না, করিমের কথাও না।তার কথা একটাই,
-এইডা আঙ্গর দ্যাশ না! এইডা মুসুরমানের দ্যাশ!


পলক-৭
জলের দরে জমি বিক্রি হয়ে গেল। জমি কেনার গায়ক পাচ্ছিল না দুলাল। অনেক খুঁজে একজনকে পেয়েছে।  সেও জমি  নিতে রাজি হয়েও পিছিয়ে যায়। বলতে গেলে জমি এক রকম লোকটিকে জমি গছিয়ে দিয়েছে দুলাল বাকি বিঘা দুই জমি আর ভিটেখানি করিমের নামে লিখে দিল। কিন্তু সমস্যা হল দুলালের মা কিছুতেই ইণ্ডিয়াতে যেতে রাজি নয়। তার কথা,
- কেডা কইল এইডা মুসুরমানের দ্যাশ? আমার জন্ম এই দ্যাশে। একাত্তুরেও পলায়া আছিলাম না, বডি দিয়া খান সেনা খেদাইছি।  বুকের দুধ ভাগ কইরা পোলাপানরে খাওয়াইছি! হিন্দু মুসুরমান দেহি নাই! এহন খুব রক্ত গরম হইছে।  মুসুরমান মুসুরমান কইরা চিল্লায়। তরা যা আমি যাই তাম না! ইষ্টিকুটুমরেও লইয়া যা..!
কারও সাধ্য নেই দুলালের মাকে এক পা সরায় তার  সিদ্ধান্ত থেকে। তিনি যা বলেন তাই করেন। সোনার কথাও শোনেন না। শেষপযর্ন্ত ঠিক হল দুলাল ইন্ডিয়ায় গিয়ে সব ঠিকঠাক করে এক বছর পরে এসে মাকে নিয়ে যাবেন। ততদিন করিম মায়ের দেখাশোনা করবেন। দহগ্রাম এলাকার দালালকে ধরে ওপারে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কিছুদিন তারা দালালের বাড়িতে গিয়ে থাকবে তারপর দালাল সুযোগ বুঝো সীমান্ত পার করে দেবে।
  পলক-৮
ভিটে  ছেড়ে এসেছে সাতদিন হয়ে গেল। এখনও কোন সুযোগ-সুবিধা হচ্ছে না। দুলালের ইচ্ছে করছে না দেশ ছেড়ে যেতে। যে দেশটাতে ছোটো থেকে বড়ো হয়েছে, ধুলোবালিকাদা লেগে আছে রক্তের ভেতর সেই দেশের মায়া বড়ই কঠিন। তাছাড়া মায়ের কথা বেশি করে মনে পড়ছে, মাকে ছেড়েও কোনোদিন কোথাও যায়নি। সোনাতো ঠাম্মার জন্য সকাল সন্ধ্যা মন খারাপ করে বসে থাকে। মা মরা মেয়ে ঠাম্মার কাছেই মানুষ। করিমের মন সব থেকে খারাপ। মেয়ের মতো দেখে এসেছে সোনাকে। তাই তো এত দূরে ছুটে এসেছে সঙ্গে নিয়ে। সীমান্ত পার না করে দিয়ে সে যাবে না। যতদিনই লাগুক।
এরই মধ্যে ইন্ডিয়া-পাকিস্থানের যুদ্ধের সম্ভবনা দেখা দেওয়ায় সীমান্তে টহল আরও জোরদার হয়েছে। সুযোগ হচ্ছে না।দালালের বাড়ি সীমান্ত থেকে ঢিল ছুড়া দূরত্বে।  দুলাল একদিন দিনের বেলা সীমান্ত ঘুরে সব দেখে এল। শিমুল গাছটাও, যার গায়ের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে কাঁটাতার পেরোতে হবে।
দেখতে দেখতে তো অনেক দিন হয়ে গেল। দুলাল দালালকে জানিয়ে দিল,
-আজ রাইতে যে কইরাই হোক পার হইতেই লাগব।
-ঠিক আছে! কিন্তু এত ঝুঁকি লইয়া যাওয়া কি ঠিক হব।
দুলাল অস্থির হয়ে উঠেছে। দেশ ছাড়ার যন্ত্রণা তাকে কুঁরে কুঁরে খাচ্ছে। তাছাড়া ওপারে সোনার কাকারা এসে অনেকদিন থেকে অপেক্ষা করে আছে। ঘন ঘন খবরও পাঠাচ্ছে।
রাত বাড়তে লাগল। সোনার গায়ে চটের বস্তা জড়িয়ে দিয়ে দুলাল নিজেও কিছু কাপড় জড়িয়ে তৈর হয়ে নিল।  সোনাকে পার করিয়ে দিয়ে করিম ফিরে আসবে। আর দালাল দুলাল ও সোনাকে ওপারের দালালের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসবে।
চারজন! ধীরে ধীরে শিমুল গাছের আড়ালে ছায়ায়  গিয়ে দাঁড়াল। সোনা শিমুল গাছের সিড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে পার  হয়ে গেল। এরপর করিম মাথায় বোচকা নিয়ে ওপরে ওঠতেই পর পর  তিনটে গুলির আওয়াজ। করিম লুটিয়ে পড়ল, দুলালও লুটিয়ে পড়ল, দালাল পালাতে গিয়ে গুলি খেয়ে পড়ে গেল। সোনাকে তার কাকারা নিয়ে পালিয়ে গেল।
পলক-৯
কিছুদিন পরে গাইবান্দা গ্রামে একজোড়া মৃত দেহ এল। দুলালের মা কখনও করিমকে আবার কখনও দুলালকে জড়িয়ে ধরে কাদঁল। গ্রামের মানুষ একজনকে কবর দিল আর একজনকে উঠানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আম গাছটা কেটে জ্বালিয়ে দিল।
এপারে এসে সোনা কয়েকদিন কারো সাথে কথা বলল না। শুধু বাবা আর করিম চাচা বলে চিৎকার করে কাঁদল। সোনাকে যারা দেখে তারাই আফসোস করে - ইস! জন্মের সময় মা-রে হারাইছে এহন বাবা রে হারাইল। কেমনে সহ্য করব!
আর কিছু দিন কাটল। সবাই সোনা কে সোনার মতো যত্ন করে রাখে। কাকারা আবদার মেটায়। ছোটো কাকা গোপাল নতুন জামা এনে দেয়। কিন্তু সোনার মন ভরে না এতেও। সে ঠাম্মাকে এনে দেওয়ার বায়না ধরে ছোটকাকার কাছে। তারপর দিন যত যায় সোনার আদরে তত ভাটা পড়ে। সোনার অঙ্গ রোদে পুড়ে ছাই বর্ণ হতে থাকে। আবারও লোকজন আফসোস করে বলে,
ইস! বাচ্চা মেয়াডারে কাহারা কিভাবে খাডায় রে। দেখলে মায়া লাগে।
এভাবে বছর ঘুরে যায়। অবসর সময়ে সঙ্গীদের সাথে ছোটাছুটি করে আবার সে কাঁঠাল পাতা দিয়ে চায়ের কাপ বানায়, সোনার সঙ্গীরা কাঁঠাল পাতায় ফুঁ দিয়ে চা খায়।
একদিন ছোটো কাকা গোপাল ওপারে গাইবান্দা গ্রামে গিয়ে হাজির হয়।  বর্ষার গাইবান্দা গ্রামের পথঘাট ডুবে রয়েছে। বিল টইটুম্বুর। দুলালের মা ভাত রান্না করছে বারান্দার উনুনে। গোপাল মাকে নিয়ে যাবে তাই মার জন্য তেমন কিছু নিয়ে আসেনি। মায়ের রুক্ষ শীর্ণ চেহারা গোপালকে আশ্চর্য  করে। সে মায়ের এমন অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করে,
মা! তোমার এই অবস্থা ক্যান?
কোন জবাব পায় না গোপাল। মা তাকে থালা ভর্তি ভাত দিলেন  হাঁসের ডিম সেদ্ধ দিয়ে।
ভাত খেতে  খেতে গোপাল মাকে বলে,
-মা তুমি যাইতা না?
-কই?
-ইন্ডিয়া!
- না!
- এহানে কই থাকবা। দুই দিন পরে তো খেদায়া দিব!
- কেডা!
- শেগেরা।
-ক্যা?
- এইডা তো শেগেগোর দ্যাশ।
- কেডা কইল এইডা শেগেগোর দ্যাশ! এই দ্যাশ আমার!
- তুমি একলা একলা থাকবা এহানে?
- একলা না! অনেক মানুষই আছে।
-  কেউ নাই!  সবাই ইন্ডিয়া যাইতাছে গা!
-যাক! আমি যাইতাম না!
গোপালও পারল না তার মাকে রাজি করাতে।দেশে নিয়ে যেতে। যাবার আগে সোনার মৃত মায়ের কিছু জিনিসপত্র গয়না একটি কাপড়ে বেঁধে সোনার জন্য দিয়ে দিলেন। বিদায়ের বেলায় গোপাল আবারও একবার মাকে জোরাজুরি করল মাকে। কিন্তু গোপালের মা যেতে যাবেই না। শুধু  বলল- 'দেহিস, সাবধানে থাহিস। তগরে আবার যাতে বাংলাদেশি কইয়া খেদাইয়া না দেয়।'
- বাংলাদেশী কইলেই হইল? ভুডের কার্ড রেশন কার্ড সব আছে!
- এই দ্যাশেও তো সব ছিল? তাইলে গেলি ক্যা!
গোপাল কিছু উত্তর না দিয়ে আস্তে ধান ক্ষেতের আল ধরে হাঁটতে শুরু করল। গোপালের মা গোপালের দিকে চেয়ে আছে। গোপাল ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছে। লম্বা গোপালের শরীরটা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে সবুজ ধানক্ষেতে মিশে যাচ্ছে। মায়ের চোখ থেকে দুফোটা জল গড়িয়ে পড়ল মাটিতে।...
' দূরে ধান ক্ষেতের  আল ধরে দৌড়ে আসছে সোনা। পিঠে স্কুল ব্যাগ পেছনে করিম আর  দুলাল।'
চোখে মুছতেই  আবার গোপালের অস্পষ্ট শরীরটা চোখে পড়ল। ধীরে মিশে যাচ্ছে সবুজ ক্ষেতে।


                                                                      ******