Tuesday, 24 July 2018

নাবিকের ডায়েরি - প্রলয় নাগ পর্ব -৪ I think therefore, I am..

নাবিকের ডায়েরি
পর্ব -৪
I think therefore, I am..

তো ইন্ট্রোর ঝক্কি পার করে একদিন নাবিক ক্লাসে এসে উপস্থিত হল। পিজির লেবেলের প্রথম ক্লাস। আর প্রথম ক্লাসেই লেট। ক্লাসে এক ঝাঁক মাছের মতো এক ঝাঁক তরুণী। কী জানি কোন কারণে  একজন ছেলেও সেদিন ক্লাসে ছিল না।  ক্লাসে ছেলেদের মধ্যে একমাত্র নাবিক, তাও কিনা ক্লাস শেষ হবে হবে করছে তখন এসেছে।
পুরনো টেরাকোটা কালারের দেওয়াল ও টিনের ছাউনি দেওয়া দুটো ঘরে ক্লাস হতো তখন। পাশে দুটো ঘরে সমস্ত স্যার ম্যাডারা একসাথে বসতেন। তারপাশেই অফিস ও অফিসের পেছনে বিভাগীয় প্রধানের ঘর।
বিভাগের সামনে বেশ কিছুটা খালি জায়গা, বাগান গোছের কিছু একটা। আর কয়েকটি গাছের গোড়ায় বসার জন্য বেদি করে দেওয়া হয়েছে। ক্লাস শেষ হলেই সবাই গিয়ে ওই বেদিগুলোতে বসতো। সবগুলো গাছ বড়ো না হলেও বেশ কিছু গাছ একটু মোটাও ছিল। আর তাতে খোদাই করা ক'জনের কত স্মৃতি! কেউ আবার গাছের আড়ালে চক দিয়ে 'বাল' কথাটাও লিখে রেখেছে।  বাংলা বিভাগের পেছনে ছিল ইতিহাস বিভাগ। নাবিকের বরাবর মনে হয়েছে ইতিহাসের মেয়েগুলো যেন বেশি সুন্দরী।
 প্রথম দিনের ক্লাস প্রায় শেষের পথে।  নাবিক পেছনের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল:
--- স্যার! আসবো?
--- এসো! এসো!
 শিক্ষকের সম্মতি পেয়ে নাবিক ক্লাস রুমে প্রবেশ করে পেছনের দিকে একটি কাঠের চেয়ারে বসল। ক্লাস যথারীতি চলতে লাগল। আসলে সেদিন ওটা ক্লাস ছিল না সেটা ছিল পরিচয়-পর্ব। গাল ভর্তি চাপ দাঁড়ি, কালো টি-শার্টে কিছু লেখা রয়েছে, খাকি জিনস আর আর উডল্যান্ডে লেগে থাকা লাল হলদে পাহাড়ী মাটি। হেসে হেসেই কথা বলছেন সবার সঙ্গে। নাম জিগেস করছেন, কোথায় থেকে এসেছি, কোন কলেজে পড়েছি ইত্যাদি,ইত্যাদি। মনে হচ্ছে এই উপত্যকার সমস্তটাই চষে বেরিয়েছেন উনি, সব জায়গাই যেন তার চেনা।  সবশেষে এলো নাবিকে পালা।
--- তুমি...?
--- নাবিক সরকার। মাথাভাঙ্গা কলেজ, কোচবিহার।
--- বেশ! তা এখানে কোথায় আছো? কোন মেসে?
--- হোয়াইট হাউসে।
--- আচ্ছা!
নাবিক বুঝেগেছে আইরংমারা সব মেসগুলোর খবরও উনি রাখেন। এরপর উনার পড়ানোর নিজস্ব শৈলী নাবিকের মতো সবাইকেই মোহিত করেছে। কথা বলার মাঝে হাত দুটো ওপরে তুলে 'কোট আনকোট', কিংবা ক্লাসে ছেলে মেয়ের ডিভাইডেশনকে ভেঙে দেওয়া  আবার পড়ানো ফাঁকে গেয়ে ওঠা ' If you miss the train i'am on" ইত্যাদি বিষয়গুলো সবাইকে আকৃষ্ট করত। নাবিকের মতো অনেকের কাছেই তা ছিল অভিনব।
নাবিকের মতো অনেকই উত্তরবঙ্গের জেলাগুলি থেকে পড়তে গিয়েছে। তখন উত্তরবঙ্গে একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়াটাই অনেক বড়ো কিছু। বি.এ ক্লাসে টিউশন পড়া আর নোট মুখস্ত করা জ্ঞানের বহর আর কতটুকু?  তারা কী করে বুঝবে উপনিবেশবাদ কী? অথচ তারা উপনিবেশের জোয়াল কাধে বহন করে চলেছে এখনও। নাবিক জন্মের পর থেকে দেখে এসেছে উত্তরের  যেন কোনও স্বতন্ত্র আইডেনটিটি নেই। সবটাই চলে দক্ষিণের অঙ্গুলি হেলনে।
ক্লাস জমতে শুরু করে। অনেক বন্ধু, তর্ক-বিতর্ক, মেইন গেটে দোকানের পেছনে সিগারেটে টান পাশাপাশি ''আমার না ওকে খুব ভালো লাগে!' এসব কিছুই চলতে থাকে। একদিকে আধুনিকতা, আধুনিকোত্তরবাদ আর অন্যদিকে স্বদেশীয় উত্তর-আধুনিকতা উঁকি মারতে থাকে।  মার্ক্স, ফ্রয়েড, ফুঁকো, লাকা দেরিদা, ফ্রেডরিক জেমসন, সার্ত্র,  গায়ত্রী স্পিভাক, প্রতীচ্য সাহিত্য তত্ত্ব পাশাপাশি বৈষ্ণব পদাবলীর সুর ঝংকার সব মিলে মেশে একাকার।   ক্লাসে স্যার বলতেন -- 'তোমরা প্রশ্ন করো? তোমাদের ভেতর যদি প্রশ্ন জাগাতে না পারি তবে সে আমারও ব্যর্থতা।"
 চিহ্ন-চিহ্নায়ক-চিহ্নায়িত, তাঁকানো থেকে দেখার চোখ সবে তৈরি হচ্ছে । নাবিক ভাবে-- I think therefore I exist. নাকি I exist therefore I think.!  সময় ও পরিসর নাবিকদেরও পাল্টে দিয়েছে। তৈরি হয় দেখার চোখ, উপনিবেশোত্তর চেতনাবাদী পাঠ কিংবা  ''আসলে আমরা কেউ পুতুল নই" বা "আসলে আমরা সবাই পুতুল" ইত্যাদি। মজিদের মাজারে জমিলার পা তুলে দেওয়া তো আসলে ক্ষমতা বা প্রতাপের বিরুদ্ধাচরণ করা। এমনি এক জমিলাও এসেছিল, চলেও গেছে, চিরতরে!  নাবিক বুঝেছে আসলে সব তত্ত্ব জীবনেই মিশে আছে, কেবল খুঁজে নিতে হয় মেলানোর জন্য।
নাবিকদের কাছে বড় পাওনা ছিল উপাচার্য মহাশয়ের ক্লাস। মেঘনাদবধ কাব্য, রক্তকরবী  পড়িয়েছেন। বুঝিয়েছেন সাহিত্যতত্ত্বের মূল নির্যাস। অমিত্রাক্ষরের ছন্দের মাঝে এসেছে গ্রীক ট্র্যাজেডির কথা,  রক্তকরবীর রাজা আর নন্দিনীর কথা কিংবা কর্ষণজীবী ও আকর্ষণজীবী মানুষের কথা। আর শেষপর্ষন্ত 'জয় নন্দিনীর জয়', প্রাণের জয়। সপ্তাহে দু' তিনটে ক্লাস নিতে ছুঁটে আসতেন। তার ক্লাস করার জন্য অনেক সিনিওর দাদারাও পেছনে বসে যেতেন। তার বই পড়েই নাবিক জেনেছে সাহিত্য সমালোচনা কেবল মাত্র প্রশস্তি নয়, ভিন্ন একটা দিকও রয়েছে। যখন তিনি সত্তরের দশকের গল্প বলতেন, গা শিউরে উঠেছে নাবিকের মতো অনেকর-ই।... ( চলবে)

No comments:

Post a Comment